গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দ্রুত কমে আসছে বহুল প্রত্যাশিত সেই নির্বাচনের জন্য অপেক্ষার দিন। হাতে সময় আছে এক মাসেরও কম। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন আগামী ২০ জানুয়ারি এবং ২১ জানুয়ারি থেকে শুরু হবে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা।নির্বাচন হবে কি হবে না, সেই সংশয় এখন আর নেই। তবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখাসহ বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ এখনো রয়েছে। তা ছাড়া এবার সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে হওয়ায় নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনকে অনেক বেশি চাপ নিতে হবে।
নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৬০টি দলের মধ্যে ৫১টি দলই আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও নিবন্ধন স্থগিত থাকা দল আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী হিসেবে পরিচিত কয়েকটি ছোট দল এই নির্বাচনে থাকছে না। তা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভোটারদের ব্যাপক অংশগ্রহণের মাধ্যমেই এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। গতকাল প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের জোটের শরিক দলগুলো নিয়ে এই নির্বাচনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের ১১ দলীয় জোটের শরিকদের সঙ্গে আসন সমঝোতা সম্পন্ন করার পথে।অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, নির্বাচনে এই দুই জোটের মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্রতর হবে।
আসন্ন নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না থাকা, বিশেষ দলের প্রতি পক্ষপাতিত্বসহ আরো কিছু অভিযোগ বিভিন্ন দলের পক্ষ থেকে তোলা হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে। অবশ্য নির্বাচন কমিশন বলছে, তারা সঠিক পথেই এগিয়ে যাচ্ছে। গতকাল এ ধরনের একটি গুরুতর অভিযোগের খবর প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের প্রার্থী সৈয়দ এহসানুল হুদার মনোনয়নপত্র ঘিরে গুরুতর অনিয়ম, তথ্য গোপন ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দাখিল করা হলফনামায় স্বাক্ষর নেই, তারিখ নেই, ছবি নেই এবং একাধিক কলাম ফাঁকা রাখা হয়েছে। এর পরও কিভাবে তাঁর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল। ইকবাল গত ৭ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনে আনুষ্ঠানিক আপিল করেছেন। তাঁর অভিযোগ, প্রথমে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হলফনামায় অসংখ্য ত্রুটি ছিল। কিন্তু বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর রাতারাতি আগের হলফনামা সরিয়ে নতুন হলফনামা আপলোড করা হয়। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে পুনরায় তদন্তের দাবি রাখে। উল্লেখ্য, গত ২২ ডিসেম্বর নিজের দল (বাংলাদেশ জাতীয় দল) বিলুপ্ত করে এহসানুল হুদা বিএনপিতে যোগ দেন। পরদিনই কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর ও নিকলী) আসনে তাঁকে ধানের শীষ প্রতীকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়।
দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এরই মধ্যে খুব খারাপ পর্যায়ে চলে গেছে। প্রতিদিনই বহু খুনাখুনির ঘটনা ঘটছে। বাড়ছে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডও। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যেও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। গত এক বছরে মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে ১৬৮ জন নিহত এবং আহত হয়েছে ২৪৮ জন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নির্বাচন যত নিকটবর্তী হবে, এসব সমস্যা তত প্রকট হবে। তাই কঠোর হাতে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে নির্বাচন যত কাছে আসবে, সংঘাত-হানাহানি তত বাড়বে।
আসন্ন নির্বাচনে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। আর তা করার দায়িত্ব অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনের। আমরা চাই, আগামী নির্বাচন হোক অবাধ, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও উৎসবমুখর।

