৪ঠা ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ  । ১৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

ভোটাধিকার লুণ্ঠনের ভয়াবহ চিত্র

বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের নামে যে পরিকল্পিত প্রহসন মঞ্চস্থ হয়েছে, জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে তার এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের তিনটি জাতীয় নির্বাচন নিয়ে কমিশনের পর্যবেক্ষণ প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে প্রশাসন, পুলিশ ও নির্বাচন কমিশনকে একটি বিশেষ দলের অঙ্গসংগঠন হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। এটি শুধু রাজনৈতিক অনৈতিকতা নয়, বরং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের নাগরিক অধিকারের ওপর সুপরিকল্পিত আক্রমণ।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০১৪ সালের নির্বাচনে ১৫৩ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভের মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকারের কফিনে প্রথম পেরেকটি ঠোকা হয়েছিল। এরপর ২০১৮ সালের নির্বাচনে ‘রাতের ভোটে’র যে জঘন্য সংস্কৃতি চালু হয়, তা ছিল বিশ্ব ইতিহাসে নজিরবিহীন। প্রায় ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালটে সিল মারা হয়েছে। সবশেষে ২০২৪ সালে ‘ডামি প্রার্থী’র যে নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে, তা দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে হাস্যরসের বিষয়ে পরিণত করেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ভোট ডাকাতির পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল ‘অভিনব ও সুপরিকল্পিত’। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল স্তম্ভসমূহ, যেমন প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা ও নির্বাচন কমিশন, যখন একটি বিশেষ দলের ইচ্ছাপূরণের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন সেই রাষ্ট্রের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ে। তদন্ত কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচনী ব্যবস্থা কমিশন থেকে সরিয়ে প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল, যা একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের ধারণাকেই ধূলিসাৎ করে দেয়। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস যথার্থই বলেছেন যে মানুষের টাকায় নির্বাচন আয়োজন করে পুরো জাতিকেই শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এটি শুধু ভোট ডাকাতি নয়, বরং জাতির সঙ্গে প্রতারণা এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়।
এখন সময় এসেছে এই জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের মুখোশ উন্মোচন করার। যারা পর্দার আড়ালে থেকে এবং সরাসরি এই ভোট চুরির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে, তাদের প্রত্যেকের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। শুধু একটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়াই যথেষ্ট নয়, বরং এই রিপোর্টের সুপারিশের ভিত্তিতে আইনিব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে যাতে আর কোনো শাসক বা গোষ্ঠী এভাবে নির্বাচনব্যবস্থাকে ‘দুমড়েমুচড়ে’ ফেলার সাহস না পায়, তার জন্য একটি শক্তিশালী নির্বাচনী কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়