চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত নজিরবিহীন নৃশংসতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারিক প্রক্রিয়ায় এক ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ কর্তৃক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ কেবল একটি আইনি নথি নয়, বরং এটি স্বৈরশাসনের অবসান ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এক অমোঘ দলিল। ৪৫৩ পৃষ্ঠার এই রায়ে যে সত্যগুলো উঠে এসেছে, তা যেকোনো সভ্য সমাজের জন্য যেমন বেদনার, তেমনি আগামীর জন্য সতর্কবার্তা।
রায়ের পর্যবেক্ষণে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে কিভাবে উসকানি ও বল প্রয়োগের মাধ্যমে রক্তাক্ত করা হয়েছিল।
একজন সরকারপ্রধানের যেখানে অভিভাবকের ভূমিকা পালন করার কথা, সেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের নাতি-পুতি’ বলে অভিহিত করে চরম অবমাননা করেছেন। রায়ে স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোটাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা যখন অহিংস আন্দোলন করছিল, তখন সরকার আন্দোলনকে যুক্তিসংগতভাবে সমাধানের সুযোগ পেয়েও তা ইচ্ছাকৃতভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর অবমাননাকর মন্তব্য, উসকানিমূলক বক্তব্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে ফোনালাপ দেশব্যাপী হামলা-নৃশংসতার ভিত্তি রচনা করে। ফোনালাপের সত্যতা ফরেনসিক পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া এবং আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের কর্মীদের হামলার প্রমাণ সাক্ষ্য-নথিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া রাষ্ট্রীয় নির্দেশনায় সংঘটিত দমন-পীড়নের ভয়ংকর রূপ তুলে ধরে।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক হলো বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ড। খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা এবং অন্য শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচার হামলার বর্ণনায় যে নৃশংসতা উঠে এসেছে, তা জাতির চেতনাকে নাড়িয়ে দেওয়া উচিত। এ ধরনের সহিংসতা কেবল রাজনৈতিক সংঘাত নয়, এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। ওবায়দুল কাদেরের ‘ছাত্রলীগই যথেষ্ট’—এমন দম্ভোক্তি যে সারা দেশে ছাত্রলীগকে হিংস্র করে তুলেছিল, তার প্রমাণও রায়ে বিধৃত হয়েছে।
এই রায়ের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের সাজা হ্রাস। রাজসাক্ষী হয়ে সত্য প্রকাশ করায় তাঁকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যা বিচারিক প্রক্রিয়ায় সত্য উদঘাটনের গুরুত্বকে প্রতিষ্ঠিত করে। একই সঙ্গে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার এবং শহীদ পরিবার ও আহতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশনা একটি অত্যন্ত মানবিক ও ন্যায়সংগত পদক্ষেপ। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো সাবেক সরকারপ্রধানকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ড পেতে হলো। এটি এই বার্তাই দেয় যে ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে জনগণের ওপর বন্দুক তাক করলে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়। আমরা আশা করি, এই রায় যথাযথভাবে কার্যকর হবে এবং জুলাই আন্দোলনের শহীদদের রক্ত ও ভুক্তভোগীদের চোখের জল ন্যায়বিচারের পরশ পাবে।

