২১শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ  । ৪ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

খুড়িয়ে চলা শ্যামনগর হাসপাতালে নতুন আতঙ্ক: বখাটেদের উৎপাত বাড়ছে চুরি

উৎপল মণ্ডল, শ্যামনগর
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দিন দিন বেড়ে চলেছে অপরাধ ও বিশৃঙ্খলা। রোগী ও স্বজনদের জন্য নিরাপদ সেবাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হাসপাতালটি এখন বখাটেদের আনাগোনা দেখা দিয়েছে।নতুন ভবন নির্মাণ কাজ বাকি থাকায় প্রতিনিয়ত রোগীদের গাদাগাদি করে থাকতে হয় তারপর আাবার নতুন আতঙ্ক বখাটেদের উউপাত। অস্থায়ী দোকানের আড়ালে মাদক বেচাকেনা, চুরি ও হয়রানির ঘটনায় আতঙ্কের স্থানে পরিণত হয়েছে এমন অভিযোগ উঠেছে রোগী, স্বজন ও হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে। স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হাসপাতালের ভেতর ও আশপাশে থাকা কিছু ডাব ও খেলনার দোকানের আড়ালে প্রকাশ্যেই মাদক বিক্রি চলছে। দিনের বেলাতেও এসব দোকানের সামনে সন্দেহজনক লোকজনের ভিড় দেখা যায়। সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। এতে করে নারী, বয়স্ক রোগী ও তাদের স্বজনরা চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, বখাটেদের অশালীন আচরণ, কটূক্তি ও হুমকির কারণে অনেকেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। পাশাপাশি হাসপাতাল চত্বরে চুরির ঘটনাও বেড়েছে। মোবাইল ফোন, টাকা-পয়সা ও ব্যক্তিগত মালামাল চুরি যাওয়ার একাধিক অভিযোগ থাকলেও হয়রানির ভয়ে অনেকেই থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে সাহস পাচ্ছেন না। এমনকি হাসপাতালের পানির লাইনের মটর চুরি হওয়া থেকে শুরু করে ছোটখাটো আসবাবপত্র খোয়া গেলেও মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রোগীর স্বজন বলেন, হাসপাতালে এসে মনে হয় আমরা নিরাপদ নই। চারদিকে বখাটে আর সন্দেহজনক লোকজন। প্রশাসনের তেমন নজরদারি দেখা যায় না। এ অবস্থার মধ্যেই হাসপাতালের ভেতরে মাদক কেনাবেচা ও চুরির সঙ্গে কিছু বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালকের জড়িত থাকার অভিযোগ সামনে এসেছে। হাসপাতাল সূত্র জানায়, বিগত দুই দিন আগে বৃহস্পতিবার রাতে হাসপাতালের পরিত্যক্ত একটি ভবনের গ্রিল চুরি করতে গিয়ে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালক আরাফাতকে হাতেনাতে আটক করেন নৈশ প্রহরী নিতিশ সরকার। এ ঘটনাটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্টদের জানা রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এছাড়া হাসপাতালের ভেতরে অবস্থান করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে আপত্তিকর মন্তব্য, মিথ্যা মামলা ও অভিযোগ এনে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে এক নারীর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দ্রুত অপসারণের দাবিতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসারের (আরএমও) কাছে লিখিত আবেদন করেছেন হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারী। অভিযোগকারীদের মধ্যে নৈশ প্রহরী নিতিশ সরকার, মো. মনিরুজ্জামান ও মো. মাসুদের স্বাক্ষর রয়েছে। লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, শ্যামনগর পৌরসভার বাদঘাটা গ্রামের হাফিজুর রহমানের স্ত্রী মোছা. ফাতেমা বেগম হাসপাতালের কোনো দায়িত্বে নিয়োজিত নন। অথচ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই তিনি দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এলাকার একটি পরিত্যক্ত ভবনে অবস্থান করছেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি নিয়মিতভাবে হাসপাতালের কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে বিরূপ ও আপত্তিকর মন্তব্য করে গোলযোগ সৃষ্টি করেন। নৈশ প্রহরীদের উদ্দেশে অশালীন ভাষায় কথা বলা, কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করে হয়রানি করা এবং নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও আনা হয়েছে। একাধিকবার তাকে হাসপাতাল এলাকা ত্যাগ করতে বলা হলেও তিনি কোনো নির্দেশ মানছেন না বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এদিকে হাসপাতালের মধ্যে মাদক কেনাবেচা ও চুরির সঙ্গে প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্স চালকদের জড়িত থাকার অভিযোগও উঠেছে। হাসপাতালের একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) রাতে হাসপাতালের পরিত্যক্ত একটি ভবনের কয়েকটি গ্রিল চুরি করতে গিয়ে প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্স চালক আরাফাত হাতেনাতে ধরা পড়েছে নৈশ প্রহরী নিতিশ সরকার দ্বারা। তবে এ ঘটনা কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে জানা গেছে। অপরদিকে অভিযুক্ত ফাতেমা বেগম অভিযোগ করেছেন, অ্যাম্বুলেন্স চালক আরাফাত, উৎপল ও সুমানসহ অন্যান্য অ্যাম্বুলেন্স চালকরা হাসপাতালের পরিত্যক্ত ভবনে বসে মাদক সেবন ও বহিরাগত মহিলাদের নিয়ে এসে তাদের সঙ্গে অসামাজিক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে, যার কারণে তাকে ওই ভবনে থাকতে দেওয়া হচ্ছে না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ ঘটনা জানলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারীও।হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, এসব ঘটনার ফলে হাসপাতালের স্বাভাবিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং কর্মরতদের মাঝে ভীতি ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে।
এবিষয়ে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. তরিকুল ইসলাম বলেন, হাসপাতালের ভেতরে ও আশপাশে বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বিঘ্নের অভিযোগ আমরা পেয়েছি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। রোগী ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জিয়াউর রহমান জানান, হাসপাতাল এলাকায় কোনো ধরনের অবৈধ কার্যক্রম বা হয়রানি বরদাশত করা হবে না। অভিযোগ যাচাই করে পুলিশ ও প্রশাসনের সহায়তায় নিরাপত্তা জোরদারসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি আরও জানান, হাসপাতালের ভেতরে বহিরাগত এক ব্যক্তি ফাতেমা বেগমের মাধ্যমে নৈরাজ্য সৃষ্টির ঘটনায় শ্যামনগর থানা পুলিশ ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিতভাবে অভিযোগ জানানো হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হলেও কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। এবিষয়ে শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ খালেদুর রহমান জানান, শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এলাকায় যেকোনো অপরাধ বা বিশৃঙ্খলার ঘটনায় পুলিশ কড়া পদক্ষেপ নেবে। হাসপাতালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব। লিখিত অভিযোগের বিষয়টি তিনি অবগত নন উল্লেখ করে বিষয়টি জেনে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়