২২শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ  । ৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

ঝিনাইদহে অস্তিত্ব সংকটে নদ-নদী, পরিকল্পনার প্রতিশ্রুতি চান ভোটাররা

ঝিনাইদহ সংবাদদাতা
ঝিনাইদহ জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদ-নদীগুলো অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। দখল আর দূষণের কবলে পড়ে একের পর এক নদী হারাচ্ছে তার স্বাভাবিক প্রবাহ। এই পরিস্থিতিতে আসন্ন নির্বাচনে এসব নদী রক্ষায় দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি চান সাধারণ ভোটাররা। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ঝিনাইদহ জেলার দিয়ে মোট ১২টি নদ-নদী প্রবাহিত। এর মধ্যে সদর উপজেলায় বেগবতি ও নবগঙ্গা; শৈলকুপায় কুমার, ডাকুয়া, গড়াই ও কালীগঙ্গা; কালীগঞ্জে ফটকি ও চিত্রা; কোটচাঁদপুরে কপোতাক্ষ ও মহেশপুরে ভৈরব, ইছামতি ও কোদলা নদী। ঝিনাইদহ অংশে এসব নদ-নদীর দৈর্ঘ্য অন্তত ৪০৩ কিলোমিটার। চিত্রা নদীর বুকে অনেক আগে থেকেই করা হচ্ছে চাষাবাদ। সম্প্রতি সরেজমিন কয়েকটি নদী পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, কোথাও অবৈধ স্থাপনা, কোথাও চাষাবাদ আবার কোথাও বর্জ্যের স্তূপ। সব মিলিয়ে চিত্রা, কুমার, নবগঙ্গাসহ জেলার ১২টি নদ-নদী সংকটে। কালীগঞ্জ শহরের পুরনো বাজার, বলিদাপাড়া, হেলাই, নিমতলা ও ফয়লা এলাকায় চিত্রা নদী দখল করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘর নির্মাণ করা হয়েছে। কাগজে-কলমে চিত্রা নদীর প্রস্থ ৮০ মিটার ও গভীরতা পাঁচ মিটার দেখানো হয়েছে। তবে দখল ও দূষণে এখন তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। নদীটি দখলমুক্ত করতে ২০২৩ সালে তালিকা প্রস্তুত করা হয়। তবে প্রভাবশালীদের বাধায় তা দখলমুক্ত করা সম্ভব হয়নি। এদিকে, শৈলকুপার একসময়ের খরস্রোতা কুমার নদ পানির অভাবে শুকিয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে। নদের কোথাও হাঁটুপানি, আবার কোথাও আবার ফসলি ক্ষেত। বেশিরভাগ এলাকায় খননের অভাবে পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। ঝিনাইদহ শহরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া নবগঙ্গা নদীতে বেশিরভাগ সময় পানি থাকে না। নদীপাড়ে গড়ে উঠেছে দোকান ও বাড়ি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পৌরসভার প্রধান ড্রেনও পড়েছে নবগঙ্গা নদীতে। ফলে পৌরসভার বর্জ্য গিয়ে পড়ছে নদীতে। পানি প্রবাহ না থাকায় দুর্গন্ধময় হয়ে পড়েছে নদীর পানি। মহেশপুরের কোদালা নদী দেখে এখন চেনার উপায় নেই। ২৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এই নদীর বুকে অসংখ্য পুকুর খনন করেছে প্রভাবশালী মহল। একই ভাবে ফটকি, বেগবতী ও কালীগঙ্গা নদী মরাখালে পরিণত হয়েছে। জেলা সংগ্রাম ও উন্নয়ন পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাব্বির আহমেদ জুয়েল বলেন, ‘নির্বাচনের আগে অনেক প্রার্থী নদী নিয়ে প্রতিশ্রুতি দেন, তবে বিজয়ী হওয়ার পর দখলদারদের সঙ্গে দফারফা করেন। আমরা এবার কোনো আশ্বাস চাই না, বরং নদীগুলো দখলমুক্ত করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা চাই। যারা নদী দখল করছে, তারা যে দলেরই হোক না কেনো, তাদের উচ্ছেদ করার সৎ সাহস যে প্রার্থী দেখাবেন, আমরা এবারের নির্বাচনে তাঁকেই সমর্থন জানাব।’ নবগঙ্গা রক্ষা পরিষদের সদস্যসচিব গাউস গোর্কি বলেন, ‘যাঁরা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন, তাঁদের নদী শাসনের ব্যাপারে সোচ্চার থাকতে হবে। আগের সরকারের মতো নদীর সংস্কার কাজের নামে অর্থ লুটপাট করা যাবে না এবং নদীরক্ষা নিয়ে কাজ করা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে নদীর আগের রূপ ফিরিয়ে আনতে হবে। শুধু নবগঙ্গা নদীই নয়, আমাদের জেলার ১২টি নদ-নদী, চিত্রা-কুমার-বেগবতী থেকে শুরু করে কপোতাক্ষ পর্যন্ত সবই এখন অস্তিত্ব সংকটে। প্রভাবশালীরা নদী দখল করে বাড়িঘর ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। গাউস গোর্কি আরো বলেন, আমরা এবার আর প্রতিশ্রুতি শুনতে চাই না। আমাদের দাবি পরিষ্কার সিএস ম্যাপ অনুযায়ী নদীগুলোর সীমানা নির্ধারণ করে সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নদ-নদী পুনখনন করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে। শহরের বর্জ্য নদীতে ফেলা বন্ধ করতে হবে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মনে রাখতে হবে নদী বাঁচলে ঝিনাইদহ বাঁচবে।’ঝিনাইদহ-১ আসনে জামায়াতের ইসলামীর প্রার্থী আবু ছালেহ মো. মতিয়ার রহমান বলেন, ‘শৈলকুপার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদ-নদীগুলো আজ মৃতপ্রায়, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে আমাদের কৃষি ও পরিবেশে। বিগত সময়ে নদী খনন ও সংস্কারের নামে কেবল লুটপাট হয়েছে, প্রকৃত কোনো কাজ হয়নি। আমরা নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শৈলকুপাসহ ঝিনাইদহের বুক চিরে বয়ে যাওয়া নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনব। কোনো দখলদারকে ছাড় দেওয়া হবে না।’ ঝিনাইদহ-২ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অ্যাড. এম এ মজিদ বলেন, ‘আমাদের শহর ও আশপাশের এলাকার জীবনরেখা হলো নবগঙ্গা-চিত্রা নদী। তবে পরিতাপের বিষয়, এই দুইটি নদী প্রভাবশালী মহলের দখলে চলে গেছে। আমরা নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করলে প্রতিটি নদ-নদী দখলমুক্ত করতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। নদী কোনো একক ব্যক্তির সম্পদ নয়, তাই জনগণের নদী জনগণকে ফিরিয়ে দিতে আমরা নদী খনন ও সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প হাতে নেব, যাতে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি সাধারণ মানুষ এর সুফল ভোগ করতে পারে।’ ঝিনাইদহ-৪ আসনের বিএনপি প্রার্থী রাশেদ খাঁন বলেন, ‘আমি নির্বাচিত হলে আমার প্রথম কাজ হবে কালীগঞ্জের চিত্রা ও বেগবতী নদীর সীমানা নির্ধারণ করে দখলদারদের হাত থেকে তা মুক্ত করা। নদী খননের নামে সরকারি অর্থের অপচয় রোধ করে সরাসরি কৃষকের উপকারে আসে- এমন টেকসই খনন কার্যক্রম আমরা পরিচালনা করব।’

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়