দেশের অর্থনীতির অবস্থা ভালো নয়। শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রায় সব ক্ষেত্রেই এক ধরনের হাহাকার চলছে। অর্থনীতির এই খারাপ অবস্থা বোঝাতে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তাদের মধ্যে নানাজন নানা ধরনের উপমা ব্যবহার করছেন। কেউ বলছেন, দেশের অর্থনীতি আইসিইউতে, কেউ বলছেন, ‘ডেড জোনে’।
অনেকের মতে, হৃৎপিণ্ড কোনো রকমে সচল থাকলেও কিডনি-লিভার প্রায় অকেজো। বিনিয়োগে স্থবিরতা, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, বড় রাজস্ব ঘাটতি, বেকারত্ব, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদহার, অদক্ষ এডিপি বাস্তবায়ন, জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার হতাশাজনক—এসব কারণে অনেকে দেশের অর্থনীতিকে ‘মুমূর্ষু’ রোগীর সঙ্গেও তুলনা করছেন। এমন পরিস্থিতিতে সবাই তাকিয়ে আছেন আসন্ন নির্বাচনের দিকে। তাঁরা আশা করছেন, রাজনৈতিক সরকার ফিরে এলে নীতিগত স্থিরতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সুযোগ তৈরি হবে।
অর্থনীতিতে নতুন করে গতির সঞ্চার হবে।
সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রকাশিত ইকোনমিক আপডেটের তথ্যে দেখা যায়, উচ্চ সুদ এবং কম ঋণই এখন অর্থনীতির বড় সংকট। এই দুই সংকট বিনিয়োগের গতি ক্রমেই কমিয়ে দিচ্ছে। উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ চক্রের পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রতিবেদনে দেখানো হয়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ দাঁড়ায় ৬.২৯ শতাংশ, যা আগের মাসেও ছিল ৬.৩৫ শতাংশ, অর্থাৎ আরো কমেছে। উচ্চ খেলাপি ঋণের ঝুঁকিতে থাকা অনেক ব্যাংক এখন কম ঝুঁকিপূর্ণ সরকারি ঋণের দিকেই বেশি ঝুঁকছে। ফলে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি এখন ২৩ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে।অন্যদিকে সুদহার ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ হওয়ায় বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা ঋণ নিতেও ভয় পান। কারণ তাঁরা নিশ্চিত নন যে এত উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে লাভজনকভাবে ব্যবসা চালাতে পারবেন কি না।
এতে নতুন ব্যবসা, কারখানা বা অন্যান্য উদ্যোগ গতি পাচ্ছে না। পুরনো ব্যবসার সম্প্রসারণ হচ্ছে না। চালু অনেক কারখানাও ধুঁকছে অথবা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। গত ১৭ মাসে কেবল ঢাকার পার্শ্ববর্তী গাজীপুর ও সাভার শিল্পাঞ্চলে ৩২৭টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। সম্প্রতি একটি সেমিনারে ব্যবসায়ী নেতা এ কে আজাদ জানিয়েছেন, উচ্চ সুদহারের কারণে এরই মধ্যে ১৪ লাখ মানুষ বেকার হয়েছে এবং আগামী ছয় মাসে আরো ১২ লাখ মানুষ বেকার হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে কেবল দেশের বিনিয়োগকারীরাই পিছিয়ে যাচ্ছেন তা নয়, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ থেকে পিছিয়ে যাচ্ছেন। সরকারের সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাবেও দেখা যাচ্ছে, বিদেশি বিনিয়োগ আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৮ শতাংশ কমেছে। অথচ দেশে প্রতিনিয়ত কর্মক্ষম জনসংখ্যা বাড়ছে। নতুন নতুন কর্মসংস্থান না হওয়ায় তারা বেকার থেকে যাচ্ছে। আবার ব্যবসা, কলকারখানা বা অন্যান্য উদ্যোগ বন্ধ হওয়ায় মানুষ বেকার হচ্ছে। তাই বেকারত্ব ক্রমেই আকাশচুম্বী করছে। আর তা শুধু অর্থনৈতিক অস্থিরতাই তৈরি করছে না, সামাজিক স্থিতিও হুমকির মুখে নিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কর্মসংস্থান কমেছে প্রায় ২০ লাখ। বর্তমানে বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পেয়ে ৪.৭ থেকে ৫ শতাংশের ঘরে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।
আমরা আশাবাদী, আসন্ন নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে বিনিয়োগ পুনরায় গতি পাবে। ব্যবসা-বাণিজ্যে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে। কর্মসংস্থান বাড়বে। সামষ্টিক অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে।

