প্রতিদিনের ডেস্ক:
বর্তমানে সবার হাতে হাতে স্মার্টফোন। না চাইলেও অনলাইন ক্লাস, ইউটিউব টিউটোরিয়লের অযুহাতে স্কুল পড়ুয়া সন্তানের হাতেও তুলে দিতে হচ্ছে স্মার্টফোন। তবে কাজের বাইরেও সন্তানরা না বুঝেই জড়িয়ে যাচ্ছে অনলাইনে নানান অপকর্মে। কেউ কেউ আসক্ত হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়, অনেকে নেশায় পড়ছে অশ্লীল ভিডিও দেখার, কেউ আবার অনলাইন গেম নামের মরণ ফাঁদে।সম্প্রতি ভারতের গাজিয়াবাদে অনলাইন গেমে অতিরিক্ত আসক্তির কারণে তিন বোনের আত্মহত্যার ঘটনা আবারও আমাদের নাড়া দিয়েছে। এর আগেও ভয়াবহ উদাহরণ দেখেছি ‘ব্লু হোয়াইল’ নামের এক ভয়ংকর অনলাইন গেমে প্রাণ গেছে বহু কিশোর-কিশোরীর। দুঃখজনকভাবে, এসব ঘটনার বেশিরভাগ ভুক্তভোগীই নাবালক।ডিজিটাল যুগে অনলাইন গেম নিজেই কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু যখন সেই গেম ধীরে ধীরে সন্তানের মানসিক জগত দখল করে নেয়, বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে, তখনই তা হয়ে ওঠে ভয়ংকর আসক্তি। প্রশ্ন হলো সন্তান অনলাইন গেমে আসক্ত হলে অভিভাবকদের কী করা উচিত? কীভাবে এই আসক্তি থেকে সন্তানকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা যায়?অনলাইন গেম আসক্তি কী এবং কেন এটি ভয়ংকর?
অনলাইন গেম আসক্তি মূলত এক ধরনের আচরণগত আসক্তি। এতে শিশু বা কিশোর গেম ছাড়া থাকতে পারে না।পড়াশোনা, খাওয়া-দাওয়া, ঘুম উপেক্ষা করে পরিবার ও বন্ধুদের থেকে দূরে সরে যায়। গেমে হারলে বা খেলতে না দিলে চরম রাগ, হতাশা বা অবসাদে ভোগে।কিছু কিছু গেম আবার মনস্তাত্ত্বিকভাবে এমনভাবে তৈরি করা হয়, যেখানে ধাপে ধাপে খেলোয়াড়কে আরও গভীরে টেনে নেওয়া হয়। ব্লু হোয়াইলের মতো গেমগুলো সরাসরি আত্মবিনাশী চ্যালেঞ্জ দিয়ে কিশোরদের মানসিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েছে যার ফল ভয়াবহ।
সন্তানের অনলাইন গেম আসক্তির লক্ষণ কী?
অভিভাবকদের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো লক্ষণগুলো আগে থেকেই চিনে ফেলা। যেমন-
১. মোবাইল বা কম্পিউটার ছাড়া অস্থির হয়ে পড়া
২. রাত জেগে গেম খেলা, দিনে ঘুমানো
৩. পড়াশোনায় হঠাৎ মনোযোগ কমে যাওয়া
৪. সামাজিক মেলামেশা এড়িয়ে চলা
৫. আগ্রাসী আচরণ, মিথ্যা বলা
৬. নিজের ঘরে নিজেকে আটকে রাখা
৭. আত্মহানির কথা বলা বা হতাশাজনক মন্তব্য করা
এই লক্ষণগুলোর একাধিক যদি একসঙ্গে দেখা যায়, তাহলে বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
১. রাগ নয়, আগে বোঝার চেষ্টা করুন
সন্তানের হাতে মোবাইল দেখেই বকাঝকা বা নিষেধাজ্ঞা দিলে সমস্যার সমাধান হয় না, বরং সন্তান আরও গোপনীয় হয়ে ওঠে। আগে বুঝতে হবে সে কেন গেমে ডুবে যাচ্ছে। একাকীত্ব? চাপ? পড়াশোনার ভয়? নাকি বাস্তব জীবনে স্বীকৃতির অভাব?
২. খোলামেলা কথা বলুন
বন্ধুর মতো কথা বলুন। জেরা নয়, প্রশ্ন করুন সহানুভূতির সঙ্গে। “তুমি কোন গেমটা খেলো?” “গেমটা খেললে তোমার কেমন লাগে?” এই আলাপই অনেক সময় সন্তানের ভেতরের চাপ বের করে আনতে সাহায্য করে।
৩. হঠাৎ সব বন্ধ করবেন না
একদিনে মোবাইল কেড়ে নেওয়া বা ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। এতে সন্তান চরম মানসিক চাপ বা রাগে আত্মঘাতী সিদ্ধান্তও নিতে পারে। ধীরে ধীরে সময় কমানোর পরিকল্পনা করুন।
৪. গেমের বিকল্প দিন
শুধু নিষেধ নয়, বিকল্প দিন-খেলাধুলা, গান, আঁকা, নাচ, বই পড়া, পরিবার নিয়ে সময় কাটানো, সন্তানকে এমন কাজে যুক্ত করুন, যেখানে সে আনন্দ পায় এবং নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে।
৫. স্ক্রিন টাইমের নিয়ম করুন
পরিবারে সবার জন্যই নির্দিষ্ট স্ক্রিন টাইম ঠিক করুন। শুধু সন্তানের জন্য নয়, অভিভাবকরাও যেন সেই নিয়ম মানেন এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
৬. প্যারেন্টাল কন্ট্রোল ব্যবহার করুন
মোবাইল ও কম্পিউটারে বয়সভিত্তিক কন্টেন্ট ফিল্টার অন রাখুন, গেম ডাউনলোড সীমাবদ্ধতা দিন, নির্দিষ্ট সময় পর লক হওয়ার অপশন চালু রাখুন-এই সুবিধাগুলো কাজে লাগান।
৭. মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিন
যদি সন্তানের আচরণে অবসাদ, আত্মহানির ইঙ্গিত বা চরম পরিবর্তন দেখা যায়, দেরি না করে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলরের সাহায্য নিন। এতে লজ্জার কিছু নেই বরং এটি দায়িত্বশীলতার পরিচয়।এক্ষেত্রে শুধু বাবা-মা নন, স্কুল, শিক্ষক ও সমাজের বড় ভূমিকা রয়েছে। শুধু পরিবার নয়, স্কুল ও সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে। একটি শিশুকে রক্ষা করতে পুরো সমাজের সহযোগিতা দরকার। যেমন-
১. স্কুলে ডিজিটাল সচেতনতা ক্লাস
২. শিক্ষকদের মাধ্যমে অভিভাবকদের সতর্ক করা
৩. কাউন্সেলিং ব্যবস্থা
৪. গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচার
৫. অনলাইন গেম বা এধনের নেশা কতটা ক্ষতিকর তা তুলে ধরা
৬. এক্সট্রা কারিকুলাম, খেলাধুলায় শিশুদের আগ্রহী করে তোলা

