২৩শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ  । ৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর

বৈষম্য ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে এবং ভোটাধিকারসহ নাগরিক অধিকার ফিরে পেতে মানুষ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে রাস্তায় নেমে এসেছিল। বুলেটের বিরুদ্ধে বুক পেতে দিয়েছিল। অবশেষে ৫ আগস্ট স্বৈরশাসনের অবসান হয়। অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) মনে করে, সেই অন্তর্বর্তী সরকারেরও সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতার পাল্লাই ভারী। সংস্থাটি মনে করে, জুলাই আন্দোলন থেকে দেশের রাজনীতিবিদ ও আমলাতন্ত্র কোনো শিক্ষা নেয়নি। সার্বিক সংস্কারপ্রক্রিয়ায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হয়নি। মব সন্ত্রাসের কারণে সহিংসতা বেড়েছে।
ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। গত সোমবার রাজধানীর ধানমণ্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ‘কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংস্থাটি। সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আওয়ামী লীগের পতনের পর রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা, সংস্কার ও নির্বাচনের ‘ভিত্তি স্থাপনের’ যে প্রত্যাশা ও দায়িত্ব ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের, দেড় বছরেও সেসব ‘নাজুক’ অবস্থায়। এ সরকারের ইতিবাচক যে অর্জন হয়েছে, তার তুলনায় ‘ঘাটতি বা পথভ্রষ্ট হওয়ার’ উপাদানের ‘পাল্লাটা তুলনামূলক ভারী’। গত ১৭ মাসে ৬০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এসব সংঘর্ষে ১৫৮ জন রাজনৈতিক কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন এবং সাত হাজার ৮২ জন আহত হয়েছেন। আর নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর ৩৬ দিনে ১৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এই অবস্থায় মব নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আসন্ন নির্বাচনে সহিংসতা বৃদ্ধির আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও খাতের দখল নিতেই মূলত সংঘাতের সৃষ্টি। এসংক্রান্ত পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। সহিংসতা ও অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত নিজেদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দলগুলো দৃশ্যত ব্যর্থ হয়েছে। ফলে উপদলীয় কোন্দল ও সংঘাত অব্যাহত রয়েছে, যা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। এ ছাড়া গণ-অভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার না হওয়ায় এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নতুন করে অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ায় সহিংসতার ঝুঁকি আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রসঙ্গে বলা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারক ও কৌঁসুলিদের নিয়োগ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। জুলাই যোদ্ধাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কিছু উদ্যোগের ক্ষেত্রে অনুদান প্রদানে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ‘অনিশ্চয়তা ও আশঙ্কা’ থাকলেও নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার যে প্রবণতা সব সময় ছিল, সেটি অব্যাহত আছে। সুষ্ঠু বা নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অর্থ, পেশিশক্তি ও ধর্ম’; এই তিনটি শক্তির অপব্যবহারের প্রকট দৃষ্টান্ত দেখা যাচ্ছে। এর ফলে বাস্তবে সমান প্রতিযোগিতাসহ কতটুকু সুষ্ঠু নির্বাচন হবে, সেটি আমাদের দেখার বিষয়।” আমরা মনে করি, সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার কিছুটা হলেও তাদের ব্যর্থতার বোঝা হালকা করবে।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়