এসএম মমিনুর রহমান, ফুলতলা
খুলনার ছয়টি আসনের মধ্যে চারটিতে জয়লাভ করেছে বিএনপি এবং দুটিতে জামায়াতে ইসলামী। আসনগুলোয় যারা পরাজিত হয়েছেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে হেরেছেন জামায়াতের আলোচিত প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী। তিনি প্রায় ৫০ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিএনপির প্রার্থী আমীর এজাজ খানের কাছে হেরেছেন।
এছাড়া অপ্রত্যাশিত পরাজয় হয়েছে সাবেক দুই সংসদ-সদস্যের। এর মধ্যে খুলনা-২ আসনে বিএনপির খুলনা বিভাগের সাবেক সংগঠনিক সম্পাদক ও মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু ও খুলনা-৫ আসনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। এবারের সংসদ নির্বাচনে সারা দেশে যত হেভিওয়েট প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য গোলাম পরওয়ার ও নজরুল ইসলাম মঞ্জু। তাদের মধ্যে গোলাম পরওয়ার ভোট পুনরায় গণনার আবেদন করতে পারেন বলে জামায়াতের একটি সূত্র জানিয়েছে।
খুলনা-২ (সদর-সোনাডাঙ্গা) আসনে পরাজিত হয়েছেন বিএনপির সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা নজরুল ইসলাম মঞ্জু। তিনি পেয়েছেন ৮৮ হাজার ১৯৭ ভোট। সাবেক এ সংসদ-সদস্যকে হারিয়ে চমক দেখিয়েছেন কেসিসির ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর জামায়াত নেতা শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল। তিনি পেয়েছেন ৯৩ হাজার ৭৭৯ ভোট। ব্যবধান ৫ হাজার ৫৮২ ভোট। নজরুল ইসলাম মঞ্জু ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তৎকালীন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজানকে হারিয়েছিলেন। ২০০১ সালে সংসদ নির্বাচনে বিএনপির তৎকালীন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আসনটি থেকে জয়লাভ করেছিলেন। এর আগে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে আসনটি বিএনপির দখলে ছিল। এ আসনটি খুলনার বিএনপির ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত ছিল। সেই ঘাঁটিতে আঘাত হেনেছে জামায়াতে ইসলামীর খুলনা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক ও আইনজীবী শেখ জাহাঙ্গীর হোসেন হেলাল। নজরুল ইসলাম মঞ্জুর পরাজয়ের পেছনে দলীয় কোন্দল বড় ফ্যাক্ট। বিশেষ করে তার নির্বাচনি কাজে নগর বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সম্পৃক্ততা নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। অন্যদিকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থীকে খুব বেশি গুরুত্ব না দেওয়া আরেকটি কারণ হতে পারে বলে অভিযোগ করেন অনেকে বিএনপি নেতা। নজরুল ইসলাম মঞ্জুর পরাজয়ে বিএনপির কতিপয় নেতা খুশি হলেও অধিকাংশ নেতা-কর্মী অখুশি। বিএনপির এই দুর্গ হাতছাড়া কোন সুখ পাচ্ছেন দলের গাদ্দাররা?
খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) আসনে পরাজিত হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। আসনটিতে জয়লাভ করেছেন বিসিবির সাবেক পরিচালক ও সাবেক সংসদ-সদস্য মোহাম্মদ আলী আজগর লবী। মাত্র ২ হাজার ৬০৮ ভোটে তিনি জয়লাভ করেছেন। বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আলী আজগর লবী ১ লাখ ৪৮ হাজার ৮৫৪ এবং জামায়াতের প্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ার পেয়েছেন ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৪৬। আসনটিতে চারজন প্রার্থী ছিলেন। অন্য দুজন প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। ৪ লাখ ২ হাজার ভোটারের আসনটিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট একটা ফ্যাক্ট ছিল। ২০০১ সালে বিএনপি জোট সরকারের আমলে গোলাম পরওয়ার আসনটি থেকে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক বিরতির পর খুলনা-২ আসনের সাবেক সংসদ-সদস্য আলী আজগর লবী দলীয় সিদ্ধান্তে খুলনা-৫ আসনে নির্বাচন করেন। অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনি জামায়াতের এ হেভিওয়েট নেতাকে হারিয়ে সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। বিষয়টি তিনি নিজে ফোনে কল করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে জানিয়েছেন। যার ভিডিও সোশ্যাল মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। জামায়াতের একটি সূত্র জানিয়েছে, গোলাম পরওয়ার ভোট পুনরায় গণনার জন্য আবেদন করেছেন। কয়েকটি কেন্দ্রের ফলাফল এবং বাজেয়াপ্ত ভোটগুলো নিয়ে তিনি সন্ধিহান। সেখানে তুলনামূলক কম ভোট পেয়েছেন গোলাম পরওয়ার। ডুমুরিয়া উপজেলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট বেশি। সেখানে তুলনামূলক কম ভোট পেয়েছেন গোলাম পরওয়ার। ভোটারদের দাবি, হিন্দু ভোটারদের সমর্থনে এবং নতুন একজন সংসদ-সদস্যকে বেছে নিতেই তারা লবীকে জয়লাভ করিয়েছেন। জামায়াতের এ হেভিওয়েট নেতার পরাজয় সহজে মেনে নিতে পারছেন না দলটির নেতাকর্মীরা।
খুলনা-১ (বটিয়াঘাটা-দাকোপ) আসনে বিএনপি প্রার্থী আমীর এজাজ খান পেয়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ৩৫২ ভোট এবং জামায়াত প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী পেয়েছে ৭০ হাজার ৩৪৬ ভোট। ব্যবধান ৫১ হাজার ছয় ভোটের। কৃষ্ণ নন্দী জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাসে প্রথম হিন্দু ধর্ম ধর্মাবলম্বী হিসাবে দলীয় মনোনয়ন পান। তিনি জামায়াতে ইসলামীর ডুমুরিয়া উপজেলা হিন্দু কমিটির সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি পেশার ব্যবসায়ী এবং তার বাড়ি খুলনার ডুমুরিয়ার চুকনগরে। আসনটিতে ১২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। ভোটার ৩ লাখ ৭ হাজার ১০৩ জন। এখানে এক লাখের বেশি ভোট রয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের। ১২ জনের মধ্যে আটজনই হিন্দু সম্প্রদায়ের। ডুমুরিয়ার বাসিন্দাকে খুলনা-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী করায় বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়নি স্থানীয় ভোটাররা। পাশাপাশি হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট বিভক্ত হয়ে যায়। আসনটি থেকে জয়ী আমীর এজাজ খান বিগত দিনে একাধিকবার সংসদ-সদস্য নির্বাচন করেছেন। এই প্রথম তিনি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। খুলনায় যত বিএনপি প্রার্থী জয়লাভ করেছেন, তাদের মধ্যে আমীর এজাজের ভোটের ব্যবধান সবচেয়ে বেশি।

