৪ঠা ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ  । ১৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

যশোর জেলার নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় আহত দেড় শতাধিক

নিজস্ব প্রতিবেদক
দু’একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্যে দিয়ে যশোরে সুন্দর পরিবেশে সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হলেও নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই সহিংস হয়ে উঠছে। গত তিন দিনে জেলায় শতাধিক হামলা, পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে জামায়াত ও বিএনপির দেড় শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। পুলিশ বলছে, সহিংসতার ঘটনাগুলোতে মূলত বিএনপি ও জামায়াতের কর্মী-সমর্থকদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এসব ঘটনার বেশির ভাগই ঘটেছে গ্রামাঞ্চলে। মূলত স্থানীয় রাজনীতির জয়-পরাজয়ের বিভেদের দ্বন্দ্বেই এসব হামলা বলছেন ভুক্তভোগীরা। এর মধ্যে দুটি ঘটনায় পাঁচ জনকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। জেলা জামায়াতের আমির ও যশোর-৪ আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য অধ্যাপক গোলাম রসুল বলেন, ‘ব্যালট বিপ্লবে যশোরের ছয়টি আসনের পাঁচটিতে ১১ দলীয় ঐক্যের পাঁচ জন প্রার্থী বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছে। ভোটের ফলাফল প্রকাশের পর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের ভোটার, কর্মী ও নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে অর্ধশতাধিক ঘটনা ঘটেছে। এতে ৬০ জনের মতো আহত হয়েছেন। প্রতিদিন জেলার কোথাও না কোথাও বিএনপির নেতাকর্মীরা আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। নির্বাচন পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা সন্তোষজনক নয়। আমরা প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাবো, জাতির এই ক্রান্তিকালে দেশের পরিবেশ শান্ত রাখার জন্য আরও শক্ত অবস্থান থাকতে হবে।’
উল্টো অভিযোগ করেছেন যশোর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জামায়াতের নেতাকর্মীরা বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করছে। পুলিশ প্রশাসনকে ব্যবহার করে আমাদের কর্মীদের মিথ্যা মামলা দিয়ে আটক করছে। তাদের কর্মীরা প্রায় ২৫টি জায়গায় হামলা করেছে। এতে অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হন। আমরা রাজনীতিক প্রতিহিংসায় বিশ্বাসী না। তবে কেউ কেউ প্রতিহিংসা দেখাতে গিয়ে বিশৃঙ্খলা করছে, এটাও ঠিক। এজন্য পাঁচ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে।’ যশোর হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শনিবার রাতে যশোরের চৌগাছার পাশাপোল জামতলাতে স্থানীয় জামায়াত অফিসে আড্ডা দিচ্ছিলেন ইউনিয়ন যুব জামায়াত সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মাসুদ। স্থানীয় বিএনপি কর্মী নিছার মেম্বারের নেতৃত্বে পাঁচ থেকে সাত জন হামলা চালালে যুব জামায়াতের সভাপতিসহ আহত হন চার জন। পরে স্থানীয়রা উদ্ধার করে চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষে এলাকায় কাজ করাতে অভিযুক্তরা তাদের ওপর হামলা করেছেন। চৌগাছা উপজেলা ফুলসারা ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রামের আবেদ আলীর বাড়িতে রামদা, লোহার রড, বাঁশের লাঠিসহ ধারালো অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ করেছে। বাড়ির জানালার গ্লাস ভাঙচুর করেছে এলাকার মেহের আলী, রবিউল ইসলাম, ইমামুল, আল আমিন, হোসেন আলী, বাবু, রাজ্জাক, মুনতাজসহ অনেকে আহত হন। ফুলসারা ইউনিয়নের দুর্গাবরকাটি গ্রামের সাবেক মেম্বার তোফাজ্জেলের বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়েছে। তার মেয়েকে বেধড়ক পিটিয়েছে। তাকে শ্লীলতাহানি করেছে। মেয়েটি ঘটনার পর আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে। শার্শার বেলতা গ্রামে নির্বাচনি কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার কারণে জামায়াতের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। বিএনপির স্থানীয় নেতা মৃত অমর বিশ্বাসের দুই ছেলে মিলন বিশ্বাস ও তরিকুল বিশ্বাসের নেতৃত্বে একটি দল অতর্কিত হামলা চালান। হামলায় অংশ নেন মনসুর ও তার দুই ছেলে মারুফ এবং মামুন, লতা ডাক্তারের ছেলে জীম, এক্সরের ছেলে টিপু, মোসলেমের ছেলে ওদু বিশ্বাস এবং মৃত কাওসারের ছেলে টুকু বিশ্বাস। হামলাকারীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে জামায়াত কর্মীদের ওপর চড়াও হন। এতে কয়েকজন আহত হন। এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শার্শা উপজেলার লক্ষ্মণপুর ইউনিয়নে বিএনপির নেতা আহসান হাবীব খোকন ও আরমানের নেতৃত্বে দফায় দফায় হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলার মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে এলাকায় ভয়ভীতি ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হচ্ছে। অন্যদিকে চৌগাছার ফুলসারা ইউনিয়নের চারাবাড়ি বাজারে জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের ছুরিকাঘাতে মোহাম্মদ বাবু নামে এক বিএনপি নেতা আহত হন। শনিবার গুরুতর অবস্থায় তাকে যশোর জেনারেল হাসপাতলে ভর্তি করা হয়। আহত বাবু ফুলসারা ইউনিয়নের ৩নং নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। ফুলসারা ইউনিয়ন কৃষক দলের সভাপতি তরিকুল ইসলাম জানান, নির্বাচনে তিনি ছিলেন ধানের শীষের পক্ষের কর্মী। রায়নগর প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে মোট ভোট ১৭৬৭। এর মধ্যে ধানের শীষ প্রতীক পেয়েছে ৬৭১টি। দাঁড়িপাল্লা প্রতীক পেয়েছে ৫৬১ ভোট। বাকি ভোট পেয়েছে অন্যরা। এই ভোট কেন্দ্রে দাঁড়িপাল্লা পাস করতে না পারায় জামায়াত-শিবির কর্মীরা ক্ষিপ্ত হয়ে তার ওপর হামলা চালান। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) আবুল বাশার বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গা থেকে বিক্ষিপ্তভাবে হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। যেখান থেকেই সংবাদ পাচ্ছি তাৎক্ষণিক পুলিশ পাঠাচ্ছি। তবে এসব ঘটনার বিষয়ে থানায় অভিযাগ করা হচ্ছে না। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়