বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘকাল যে সংঘাত, অসহিষ্ণুতা এবং ‘বিজয়ী বনাম বিজিতের মনস্তত্ব বিরাজমান ছিল, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তা এক অভাবনীয় ও ইতিবাচক মোড় নিতে দেখা গেল। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেওয়ার আগেই রোববার রাতে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসভবনে গিয়ে যে রাজনৈতিক সৌজন্য দেখিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে দেশের ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। সাধারণত নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর আমাদের দেশে দুপক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়, সহিংসতা কিংবা পরাজিত পক্ষকে দমন-পীড়নের সংস্কৃতি দেখা যায়। বলতেই হবে, তারেক রহমানের এই উদ্যোগ সেই প্রচলিত ধারার বিপরীতে এক ‘নতুন বার্তা’। বিজয়ী দলের প্রধান যখন বিরোধীদলীয় নেতাদের দরজায় কড়া নাড়েন এবং কুশল বিনিময় করেন, তখন তা কেবল সৌজন্য সাক্ষাৎ থাকে না; বরং তা গণতন্ত্রের জন্য এক স্বস্তিদায়ক বাতাবরণ তৈরি করে।
ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে যারা একসময় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছেন, নির্বাচনের মাঠে তারা প্রতিদ্বন্দ্বী হবেন-এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন শত্রুতায় রূপ না নেয়, সে বার্তাটিই এই সাক্ষাতের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এ সময় ‘সরকার ও বিরোধী দল মিলে জনগণের কল্যাণে কাজ করা’ এবং ‘সংসদে গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকা পালন’ করার যে অঙ্গীকার এসেছে, তা আদতে সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রকৃত চেতনার বহিঃপ্রকাশ। জাতীয় সরকারে না গিয়েও বিরোধী দলে থেকে যে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করা যায়-এ অবস্থান রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে তারেক রহমানের এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসায় গমন এবং তরুণ নেতৃত্বের সঙ্গে এই মিথস্ক্রিয়া প্রমাণ করে, আগামী দিনের বাংলাদেশ গঠনে প্রবীণ ও নবীন নেতৃত্বের সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর সময় অন্য দলের নেতাদের সহমর্মিতা এবং বর্তমান বিজয়ী দলের এই পালটা সৌজন্য-উভয়ই একটি পরিপক্ব রাজনৈতিক সংস্কৃতির জানান দিচ্ছে। দেখাচ্ছে, রাজনীতির মাঠ কেবল প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার স্থান নয়, বরং বিপদে পাশে দাঁড়ানোর এবং অর্জনে অভিনন্দন জানানোর স্থানও বটে।
তবে এই শুভ সূচনা যেন কেবল লোকদেখানো আনুষ্ঠানিকতা বা নির্বাচন-পরবর্তী সাময়িক আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। ক্ষমতার বলয়ে প্রবেশের পর অনেক সময়ই ঔদ্ধত্য ভর করে, আর বিরোধীরাও তখন ধ্বংসাত্মক পথ বেছে নেয়। সেই পুরোনো বৃত্ত থেকে আমাদের বের হতে হবে। আমাদের প্রত্যাশা-নির্বাচনের পর সৃষ্ট এই সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ টেকসই হোক। তারেক রহমান যে ‘ইতিবাচক রাজনীতির’ ডাক দিয়েছেন এবং ডা. শফিকুর রহমান ও নাহিদ ইসলাম যেভাবে তাকে স্বাগত জানিয়েছেন, তা যেন আগামী দিনে সংসদ ও রাজপথ-দুই স্থানেই বজায় থাকে। একটি স্থিতিশীল, গণতান্ত্রিক ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনে এ পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও গঠনমূলক সম্পর্কের সুন্দর ধারাটি যেন কোনোভাবেই পথ না হারায়।

