আহসান হাবিব বরুন
ধর্মীয় উৎসব মানেই শুধু আধ্যাত্মিক অনুশীলন বা পারিবারিক মিলন নয় বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বাজার-অর্থনীতির এক বিশেষ ঋতু। পবিত্র রমজান ও ঈদুল ফিতর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে, আর বড়দিন খ্রিস্টান প্রধান দেশগুলোতে—এই সময়টাকে ঘিরে খুচরা বাজারে দেখা যায় ছাড়, অফার, প্যাকেজিং ও বিশেষ প্রচারণার ঢেউ। প্রশ্ন হলো—যেখানে বিশ্ববাজারে উৎসব মানে মূল্যহ্রাস, সেখানে বাংলাদেশে কেন প্রায়শই দেখা যায় উল্টো চিত্র?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের তাকাতে হবে বৈশ্বিক চর্চা, আঞ্চলিক অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের বাজার-বাস্তবতার দিকে।
পবিত্র রমজানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে কী ঘটে, তা একবার দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতে বড় বড় খুচরা চেইন—যেমন কেয়ারফোর লুলু হাইপার মার্কেট—রমজান উপলক্ষে চাল, ডাল, তেল, খেজুর, মুরগি, গরুর মাংস, দুগ্ধজাত পণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যে বিশেষ ছাড় ঘোষণা করে। সরকারও মূল্যতালিকা পর্যবেক্ষণ করে এবং অতিরিক্ত মুনাফা ঠেকাতে সক্রিয় থাকে।
সৌদি আরবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় রমজানের আগে বাজার তদারকি জোরদার করে। প্রয়োজন হলে আমদানি শুল্ক সাময়িক কমানো, অতিরিক্ত মজুতদারির বিরুদ্ধে অভিযান, এবং ভোক্তা অভিযোগ ব্যবস্থাকে কার্যকর রাখা হয়। ফলে ব্যবসায়ীরা জানেন—রমজান মানে শুধু বাড়তি বিক্রি নয়, বরং প্রতিযোগিতামূলক মূল্য।
বড়দিনের সময় ইউরোপ ও আমেরিকার চিত্রও একই রকম। যুক্তরাষ্ট্রে ওয়ালমার্ট, টার্গেট কিংবা আমাজন—সবাই ‘হলিডে সেল’ ঘোষণা করে। ক্রিসমাস-পূর্ব সপ্তাহগুলোতে খাদ্যপণ্য থেকে ইলেকট্রনিক্স পর্যন্ত বড় ছাড় দেওয়া হয়। কারণ একটাই—উৎসবের সময় ভোক্তার চাহিদা বাড়ে, আর সেই বাড়তি চাহিদাকে আকর্ষণ করতে ব্যবসায়ীরা মূল্য কমিয়ে বিক্রির পরিমাণ বাড়াতে চান। অর্থনীতির ভাষায়, কম মার্জিনে বেশি ভলিউম। অর্থাৎ, বিশ্ববাজারে উৎসব হলো “ডিমান্ড স্পাইক”–কে পুঁজি করে বিক্রি বাড়ানোর সুযোগ। এর মানে হলো, তীব্র প্রতিযোগিতা, ভোক্তা-সচেতনতা আর নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো সক্রিয় ভূমিকা মিলে মূল্যছাড়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে রমজান আসার আগেই বাজারে এক অদৃশ্য উত্তাপ তৈরি হয়। চাঁদ দেখা যাওয়ার আগেই চাল, ডাল, সয়াবিন তেল, চিনি, খেজুর, ছোলা, গরু-ছাগলের মাংস—সবকিছুর দাম বাড়তে শুরু করে। ঈদের আগে পোশাক ও জুতার দাম বাড়ে, কোরবানির আগে পশুর বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি হয়।
সরবরাহ-ব্যবস্থার দুর্বলতা, সিন্ডিকেট, মজুতদারি এবং নিয়ন্ত্রণহীন মধ্যস্বত্বভোগী যখন একসঙ্গে মিশে যায়, তখন তা রূপ নেয় ‘উৎসব-নির্ভর মূল্য-সংকটে’।
বাংলাদেশের বাজার কাঠামোতে কয়েকটি মৌলিক সমস্যা রয়েছে—
১. চিনি, ভোজ্যতেল, ডাল, গমসহ বহু পণ্য আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য দোলাচল, ডলার সংকট বা এলসি জটিলতা—এসবের প্রভাব সরাসরি পড়ে ভোক্তার ওপর। কিন্তু প্রশ্ন থাকে—আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে কেন দেশীয় বাজারে তা দ্রুত প্রতিফলিত হয় না?
২. খুচরা পর্যায়ে অনেক বিক্রেতা থাকলেও আমদানি ও পাইকারি পর্যায়ে প্রভাবশালী কয়েকটি গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এই অঘোষিত সমন্বয়মূলক আচরণই ‘সিন্ডিকেট’ নামে পরিচিত। প্রতিযোগিতা দুর্বল হলে মূল্যছাড়ের প্রণোদনা কমে যায়।
৩. রমজানের সময় ভোক্তা অধিকার সংস্থা ও প্রশাসনের অভিযান বাড়ে বটে, কিন্তু তা প্রায়ই মৌসুমি। সারা বছর ধরে কঠোর নজরদারি ও তথ্যভিত্তিক বাজার বিশ্লেষণ না থাকলে উৎসবের আগে বাড়তি চাহিদা কাজে লাগিয়ে কেউ কেউ সুযোগ নেয়।
৪. বাংলাদেশে ভোক্তা অধিকারের চর্চা এখনও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্ত নয়। অধিকাংশ মানুষ অতিরিক্ত দাম দিলেও লিখিত অভিযোগ করেন না। ফলে বাজারে জবাবদিহিতা তৈরি হয় না। উৎসবের সময় মূল্যছাড় শুধু অর্থনীতির বিষয় নয় বরং এটি সামাজিক চুক্তিরও অংশ। মুসলিম বিশ্বে রমজান সংযম, সহমর্মিতা ও আত্মশুদ্ধির মাস। খ্রিস্টান বিশ্বে বড়দিন দান ও উদারতার প্রতীক।
অথচ বাংলাদেশে প্রায়শই দেখা যায়—রমজান এলেই কেউ কেউ বাড়তি মুনাফার সুযোগ খোঁজেন। এটি অর্থনৈতিক সমস্যার পাশাপাশি নৈতিকতার সংকটও বটে।
ব্যবসা অবশ্যই লাভের জন্য। কিন্তু ‘ন্যায্য মুনাফা’ ও ‘সুযোগসন্ধানী মুনাফা’ এক জিনিস নয়। বিশ্ববাজারে বড় খুচরা চেইনগুলো জানে—উৎসবে কম দামে বিক্রি করলে ব্র্যান্ডের প্রতি আস্থা বাড়ে, দীর্ঘমেয়াদে গ্রাহক ধরে রাখা যায়। বাংলাদেশে স্বল্পমেয়াদি লাভের মানসিকতা দীর্ঘমেয়াদি সুনামকে ছাপিয়ে যায়। সরকারি উদ্যোগে কখনো কখনো ভোজ্যতেল ও চিনির দাম নির্ধারণ, টিসিবির মাধ্যমে ভর্তুকি দামে পণ্য বিক্রি, আমদানি শুল্ক কমানো—এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কিন্তু সমস্যা হলো—এগুলো প্রায়শই প্রতিক্রিয়াশীল, পূর্বপ্রস্তুতিমূলক নয়।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রমজানের কয়েক মাস আগে থেকেই সরবরাহ পরিকল্পনা, মজুত ব্যবস্থাপনা ও মূল্য পর্যবেক্ষণ শুরু হয়।
এক্ষেত্রে দেশে কিছু কার্যকর উদ্যোগ নেয়া জরুরি,যেমন-
১.প্রতিদিনের পাইকারি ও খুচরা দামের ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড জনসম্মুখে প্রকাশ করলে অস্বাভাবিক ওঠানামা দ্রুত ধরা পড়বে।
২. কার্টেল বা সমন্বিত মূল্যবৃদ্ধির প্রমাণ পেলে দ্রুত তদন্ত ও জরিমানা নিশ্চিত করতে হবে।
৩. পণ্যের এলসি ও কাস্টমস প্রক্রিয়া দ্রুততর করা গেলে কৃত্রিম সংকট কমবে।
৪. জনসচেতনতা ও অভিযোগ ব্যবস্থাকে সহজ ও নিরাপদ করতে হবে।
৫. ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো নিজেরাই যদি রমজান ও ঈদ উপলক্ষে স্বেচ্ছা মূল্যছাড় কর্মসূচি নেয়, তবে তা ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। বিশ্বায়নের যুগে তথ্য গোপন থাকে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ জানে—দুবাই, রিয়াদ, নিউইয়র্ক বা লন্ডনে উৎসব মানে সেল। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—ঢাকায় কেন নয়?বাংলাদেশ দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতি। মাথাপিছু আয় বেড়েছে, অবকাঠামো উন্নত হয়েছে। কিন্তু বাজার-শৃঙ্খলা ও ভোক্তা-অধিকারের ক্ষেত্রে যদি আমরা আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে না পারি, তবে উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে কখনোই পৌঁছাবে না। ঈদ, রমজান বা বড়দিন—এই উৎসবগুলো মানুষের আনন্দ, সংহতি ও উদারতার বার্তা বহন করে। বিশ্বজুড়ে ব্যবসায়ীরা এই সময়টাকে দেখেন গ্রাহকের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার সুযোগ হিসেবে। বাংলাদেশেও কি তা সম্ভব নয়? অবশ্যই সম্ভব—যদি আমরা স্বল্পমেয়াদি মুনাফার বদলে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা বেছে নিই। যদি সরকার, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা—তিন পক্ষ মিলিয়ে একটি ন্যায্য বাজার-সংস্কৃতি গড়ে তুলি। উৎসবের প্রকৃত আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন বাজারে গিয়ে মানুষ একটু স্বস্তিতে কেনাকাটা করতে পারে। তাদের মুখে ফুটে ওঠে এক চিলতে হাসি। সুতরাং পবিত্র রমজান ও ঈদ ঘিরে খুলে যাক ব্যবসায়িক মহলের বন্ধ হৃদয়ের জানালা।
লেখক: সাংবাদিক কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক,ঢাকা।

