অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অবশেষে দেশের হাল ধরেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি। গতকাল শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে নতুন সরকারের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে। নতুন সরকারকে স্বাগত। বিগত ১৭ বছর বিএনপিকে কার্যত দেশের রাজনীতির বাইরে রাখা হয়েছিল। শেখ হাসিনার শাসনামলে মিথ্যা মামলায় দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে কারাবরণ করতে হয়েছে। দেশে ফিরতে পারেননি তারেক রহমান। কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারেনি বিএনপি। দলটির হাজার হাজার নেতাকর্মীকে মিথ্য মামলায় বছরের পর বছর জেল খাটতে হয়েছে। বৃহত্তর এই রাজনৈতিক শক্তিকে বাইরে রেখে একের পর এক বিতর্কিত নির্বাচন করেছে হাসিনা সরকার। একসময় বিএনপির অস্তিত্ব পর্যন্ত বিপন্ন হয়েছিল। অবশেষে চব্বিশের গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে হাসিনা সরকারের পতন হয়। দায়িত্ব গ্রহণ করে অন্তর্বর্তী সরকার।রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ১৭ বছরের প্রবাসজীবনের ইতি টেনে দেশের মাটিতে পা রাখেন তারেক রহমান। তাঁর সেই প্রত্যাবর্তন ঐতিহাসিক। কিন্তু তারেক রহমান দেশে ফেরার কয়েক দিনের মাথায় বেগম খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করেন। সেই শোকের আবহ কাটিয়ে নির্বাচনী প্রচারে যোগ দেন তিনি। অল্প দিনের প্রচারে ব্যাপক সাড়া মেলে, যার প্রতিফলন ঘটেছে জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির অভাবনীয় বিজয়ে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক গৌরবময় অধ্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী এই দলটি। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত ধরে একদলীয় শাসনব্যবস্থা থেকে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে। নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনেও স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশে দেশবাসী বিএনপিকে রায় দিয়েছিল। বলা যায়, দেশের বিভিন্ন সংকটে হাল ধরেছে বিএনপি। এবারও তার ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে না। বর্তমানে দেশের অর্থনীতি মারাত্মক খরায় ধুঁকছে, আস্থার অভাবে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে। বেকার সমস্যা প্রবল। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। এমন দুঃসময়ে বিএনপি তথা তারেক রহমানের ওপর আস্থা রেখেছে দেশবাসী। বলা হয়ে থাকে, নতুন সরকারের কাছে জনতার প্রত্যাশা অনেক। বিগত সরকারের আমলে আমরা কাজের চেয়ে কথা বেশি পেয়েছি। অনেকে বাগাড়ম্বর করেছেন—বাংলাদেশকে ইউরোপ-সিঙ্গাপুর বানাবেন। নতুন সরকারকে এ বিষয়টি মনে রাখতে হবে—আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের চাওয়া আসলে তেমন না। তারা স্বদেশকে ইউরোপ-আমেরিকা হিসেবে দেখতে চায় না; বরং তারা একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ দেখতে চায়। যে দেশে কোনো নাগরিকের অধিকার হরণ করা হবে না; সংখ্যালঘু, নৃগোষ্ঠী বলে কারো ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হবে না; ভিন্নমতের কারণে কাউকে জেলে যেতে হবে না; সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠ রোধ করা হবে না—আমরা তেমন বাংলাদেশ চাই। বলা বাহুল্য, এগুলো সবটাই নাগরিকের অধিকার। সরকারের দায়িত্ব রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা, কিন্তু আমাদের অধিকার বারবার ভূলুণ্ঠিত হয়। নতুন সরকারকে জনতার দীর্ঘদিনের অভাব-আক্ষেপের মূল্য বুঝতে হবে। যে প্রত্যাশা নিয়ে চব্বিশের গণ-আন্দোলনে সর্বস্তরের মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল— নতুন সরকারকে সেই বাংলাদেশ উপহার দিতে হবে। জনতুষ্টিমূলক পদক্ষেপ নয়, বরং সরকারকে জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গঠনে আন্তরিক পদক্ষেপ নিতে হবে।

