৯ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ  । ২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার ও জনগণের যৌথ দায়িত্ব

সিরাজুল ইসলাম
রমজান মাস আসা মাত্রই বাংলাদেশের বাজারে ক্রমেই দেখা যায় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। গরিব থেকে মধ্যবিত্ত পর্যন্ত সবাই রোজার দিনে খাদ্যদ্রব্যের হাহাকার অনুভব করে। একদিকে মানুষ তার ধর্মীয় কর্তব্য পালন করছে, অন্যদিকে বাজারের অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি মানুষের সাধারণ জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তোলে। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গতকাল দেশের মানুষের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা শুধু সরকারের নয়, জনগণেরও দায়িত্ব। সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া আমাদের অগ্রাধিকার।’ এই বক্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে যে, রমজানে সবার কল্যাণে বাজারকে নিয়ন্ত্রণে রাখা একটি সামগ্রিক সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব।
প্রথমেই বোঝা দরকার, কেন রমজানে বাজারে দ্রব্যমূল্য বাড়ে। রমজান মাসে চাহিদা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেড়ে যায়। খাদ্যপণ্য, বিশেষ করে চাল, তেল, মসলা, দুধ ও পেঁয়াজের চাহিদা বেশি থাকে। বিক্রেতারা এই সুযোগ ব্যবসায়িক সুবিধা হিসেবে ব্যবহার করে মূল্য বাড়িয়ে দেন। এতে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার, বিপর্যস্ত হয়। সরকার যে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আসে তা যথেষ্ট হলেও অনেক সময় তা কার্যকর হয় না, কারণ সিন্ডিকেট বা কুচক্রী ব্যবসায়ীরা বাজারে মনগড়া মূল্য ছড়িয়ে দেয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন, ‘সরকার শুধু বাজার মনিটরিং করবে না, আমরা সিন্ডিকেট ভেঙে দেবে। কেউ চাহিদার সুযোগ নিয়ে দাম বাড়ালে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ এই বক্তব্যে বোঝা যায়, প্রশাসনিক পদক্ষেপ যেমন জরুরি, তেমনি শক্তিশালী মনিটরিং এবং নজরদারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একইসাথে সরকার এ বিষয়ে সজাগ রয়েছে- সে বার্তাও পরিষ্কার।
রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সাধারণ মানুষেরও ভূমিকা অনস্বীকার্য। খাদ্যদ্রব্যের চাহিদা ও ক্রয় সম্পর্কে সচেতন থাকা, অপ্রয়োজনীয় জোগানের চেষ্টা না করা এবং দরকার হলে অনলাইন বা কমিউনিটিভিত্তিক বাজারে সঠিক তথ্য প্রচার করা মানুষের দায়িত্ব। রমজানের এই মাসকে শুধু ধর্মীয় না, বরং সামাজিক দায়বদ্ধতার মাস হিসাবেও দেখা যায়। ইসলাম শিক্ষা দেয় যে, দারিদ্র্য ও ক্ষুধার্ত মানুষের প্রতি সহানুভূতি থাকা উচিত। মহানবী মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার প্রতিবেশীকে ক্ষুধার্ত থাকা দেখেও খাবার ভাগাভাগি করে না, সে সম্পূর্ণ নৈতিকভাবে অব্যবস্থাপনা করছে।’ এই ধর্মীয় নৈতিকতা বাজার নিয়ন্ত্রণেও প্রযোজ্য। যদি প্রতিটি ব্যক্তি সঠিকভাবে প্রয়োজন অনুযায়ী কেনাকাটা করে, অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি না করে, তবে মূলত সিন্ডিকেট বা মূল্য বাড়ানোর সুযোগ অনেকাংশে সীমিত হবে।
বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থা এমন যে, একদিকে সরকারি নজরদারি আছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের সচেতন অংশগ্রহণ অপরিহার্য। সিন্ডিকেট ভাঙা মানে শুধু বড় ব্যবসায়ী বা পাইকারীকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়; এটি মানে প্রতিটি স্তরে সঠিক তথ্য, সতর্কতা ও নৈতিক দায়িত্ব নিশ্চিত করা। যেমন, ছোট দোকানদাররা যদি সরকারী নিয়ম মেনে চলেন, দাম বাড়াতে না চান এবং অতিরিক্ত মজুত না রাখেন, তাহলে পাইকারি সিন্ডিকেটও ভেঙে যাবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যের মূলমন্ত্রও এই মিলিত দায়িত্বের ওপরই কেন্দ্রিভূত।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক সচেতনতা। মিডিয়া, সামাজিক সংগঠন এবং কমিউনিটি নেতারা যদি বাজারের অবস্থা নিয়মিত জনগণকে জানান, অস্বাভাবিক দাম বাড়ানোর ঘটনা তুলে ধরেন, তবে ক্রেতারাও জানবে কোথায় বেশি দাম, কোথায় কম। এতে বাজারে স্বাভাবিক চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য বজায় থাকে। উদাহরণস্বরূপ, সম্প্রতি ঢাকায় পেঁয়াজের দাম প্রচণ্ডভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। স্থানীয় মিডিয়ার রিপোর্ট ও সামাজিক প্রচারণার কারণে সেই সিন্ডিকেট চরমে পৌঁছানোর আগে প্রশাসন ও জনসাধারণের নজরে আসে এবং পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে।
রমজান মাসে মূল্যবৃদ্ধি কমাতে সরকারী পদক্ষেপ যেমন জরুরি, তেমনি নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক দায়িত্বও অপরিহার্য। ইসলাম শিক্ষা দেয় যে, দারিদ্র্য মানুষের প্রতি সহানুভূতি দেখানোই নৈতিকতা। যদি প্রতিটি ক্রেতা চাহিদার বাইরে কেনাকাটা না করে, অনলাইন বা বিভিন্ন চ্যানেল ব্যবহার করে বাজারের তথ্য জানে এবং দোকানদাররা ন্যায্য মূল্যে পণ্য সরবরাহে উৎসাহী হয়, তবে বাজারে সিন্ডিকেট ভাঙা সহজ হবে।
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের আরেকটি দিক হলো অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা। মূল্য বাড়লে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। গরীব পরিবারের জন্য মাসের খাবারের ব্যবস্থা কঠিন হয়ে পড়ে। আর মধ্যবিত্তও অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধে মানসিক চাপের মুখোমুখি হয়। এই প্রভাব সরাসরি সমাজের সামগ্রিক শান্তি ও কল্যাণে প্রভাব ফেলে। তাই রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ শুধু ধর্মীয় বা নৈতিক বিষয় নয়; এটি সামাজিক স্থিতিশীলতা ও শান্তির নিশ্চয়তারও বিষয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু দাম স্থিতিশীল রাখা নয়, মানুষ যাতে রমজানের মাহাত্ম্য পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করতে পারে, তা নিশ্চিত করা।” এ বক্তব্যে স্পষ্ট যে, সরকার শুধুমাত্র আইন প্রয়োগে সীমাবদ্ধ নয়; জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সামাজিক নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে বাজার নিয়ন্ত্রণে বিশ্বাসী।
মানুষেরও দায়িত্ব আছে। ক্রেতারা সচেতনভাবে কিনবেন, অতিরিক্ত মজুত বা স্টক করবেন না এবং নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী কেনাকাটা করবেন। কমিউনিটি ও সামাজিক সংস্থা বাজার মনিটরিংয়ে সহায়তা করতে পারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় সংস্থা ধর্মীয় মূল্যবোধের পাশাপাশি নৈতিক ক্রয়-বিক্রয়ের গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে শিক্ষিত করতে পারে।
এক কথায়, রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এককভাবে সরকারী পদক্ষেপ নয়; এটি রাষ্ট্র ও জনগণের যৌথ দায়িত্ব। সরকারের শক্তিশালী মনিটরিং, সিন্ডিকেট ভাঙার পদক্ষেপ এবং জনগণের সচেতন অংশগ্রহণ মিলিয়ে একটি সুস্থ, ন্যায্য ও মানবিক বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব। এই মাসে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করার পাশাপশি মানুষের কল্যাণে সচেতন থাকা এবং ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা প্রত্যেক নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব।
পরিশেষে বলা যায়, রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ মানে শুধু বাজারের ভারসাম্য নয়; এটি মানুষের নৈতিকতা, মানবিক সহানুভূতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতারও পরিচয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষণার মতো, শুধুমাত্র প্রশাসন নয়, সমাজের প্রতিটি স্তর এই লক্ষ্য অর্জনে সক্রিয় ভূমিকা রাখলে সত্যিই রমজান হবে মানুষের জন্য আনন্দময়, শান্তিপূর্ণ এবং ন্যায়সঙ্গত।
লেখক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়