লোকে বলে, মানুষ চলে গেলে রেখে যায় স্মৃতি। আর অন্তর্বর্তী সরকার চলে গেছে, কিন্তু রেখে গেছে পাহাড়সম বোঝা। সেই বোঝার চাপে পিষ্ট হতে চলেছে নতুন সরকার। নতুন কাজে হাত দেওয়ার পরিবর্তে পুরনো ধারদেনা মেটাতেই ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। হাসিনা সরকারের দুঃশাসন হটাতে চব্বিশের গণ-আন্দোলনের পর ক্ষমতা গ্রহণ করে অন্তর্বর্তী সরকার। মানুষ অনেক আশা করেছিল, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের হাত ধরে দেশের সবকিছু সচল হবে, কিন্তু সেই আশার গুড়ে বালি। খবরে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাগুলো হলো—ব্যাংকিং খাতে ভগ্ন দশা, ব্যবসায়ীদের আস্থাহীনতায় বিনিয়োগে মন্দা, বড় মাত্রায় রাজস্ব ঘাটতি, উচ্চ সুদহারের কারণে রুগ্ণ বেসরকারি পর্যায়ে ব্যবসা-উদ্যোগ, বেকারত্বের উচ্চহার, মব সন্ত্রাস জনজীবনে নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিরতা। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতির কয়েকটি মহাসংকট চিহ্নিত করেছে বিশ্লেষকমহল। এর মধ্যে রয়েছে—২৩ লাখ কোটি টাকার ঋণের বোঝা, সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকার ঋণখেলাপি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ২১ লাখ মানুষের কর্মহীনতা, তলানিতে নামা রাজস্ব আয়, স্থবির বেসরকারি বিনিয়োগ এবং বাজেটে ঘাটতি মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভরতা। এমন খাদের কিনারে থাকা দেশের হাল ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। খবরে বলা হয়েছে, ২৩ লাখ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণ ১৬ লাখ কোটি আর বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ সাড়ে সাত লাখ কোটি টাকা।
পরিস্থিতি এমন শোচনীয় যে ঋণ পরিশোধ করতে নতুন সরকারকে এখন পুনরায় ঋণ নিতে হবে। অর্থাৎ ঋণের জালেই আটকা থাকতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছয় লাখ ৪৪ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকার বেশি, যা মোট ঋণ বিতরণের প্রায় ১৬ শতাংশ। গ্রাহকের আস্থার সংকট ও মূলধন ঘাটতির কারণে দীর্ঘদিন এই খাতে অস্থিরতা বিরাজ করছে। এমন শোচনীয় পরিস্থিতির মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার মেয়াদের একেবারে শেষ প্রান্তে নতুন পে স্কেল ঘোষণা করেছে, যার ঘানি এখন টানতে হচ্ছে নতুন সরকারকে।
এ জন্য সরকারি কোষাগারে বছরে অতিরিক্ত এক লাখ ছয় হাজার কোটি থেকে এক লাখ আট হাজার কোটি টাকার বোঝা বাড়বে। এই বর্ধিত ব্যয় মেটাতে এই সরকারকে এক হয় নতুন ঋণ নিতে হবে, তা না হলে টাকা ছাপাতে হবে। সব মিলিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে মহা কঠিন চ্যালেঞ্জ।
বিশ্লেষকমহল জানিয়েছে, সংকট পর্বতসম হলেও তা অতিক্রম করা যাবে না—এমন না। এ জন্য নতুন সরকারকে কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার যেসব বৈদেশিক চুক্তি করেছে, সেগুলোতে কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হয়েছে কি না, তা নিবিড় পর্যালোচনা জরুরি। এ জন্য একটি বিশেষজ্ঞদল গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। আমরাও বিষয়টি জরুরি বলেই মনে করি। বিশেষজ্ঞদলের প্রতিবেদন ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে নতুন সরকারকে সামনের দিকে অগ্রসর হতে হবে।

