প্রতিদিনের ডেস্ক:
উত্তর ভারতের শহরগুলোতে শীতকালে কাশ্মীরি শাল বিক্রেতাদের হাঁকডাক ছিল চেনা দৃশ্য। কিন্তু সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে একের পর এক হামলা ও হয়রানির ঘটনায় সেই দৃশ্য এখন আতঙ্কে ঢেকে গেছে। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে কাশ্মীরে ফিরে যাচ্ছেন।
হরিয়ানার হিসার শহরে ঘরে ঘরে শাল ও হস্তশিল্প বিক্রি করেন ২৮ বছর বয়সী আয়াজ আহমদ।সম্প্রতি তিনি একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলেছেন, যেখানে প্রায় দুই ডজন কাশ্মীরি ব্যবসায়ী একে অন্যকে ‘নিরাপদ’ ও ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ এলাকা সম্পর্কে সতর্ক করেন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে আয়াজ বলেন, ‘এখানে সদস্যদের কোথায় যাওয়া নিরাপদ আর কোথায় নয় তা জানানো হয়। এখন আমাদের অগ্রাধিকার ব্যবসা নয়, নিরাপত্তা। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো সদস্য হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
’পরিচয়ের কারণে হামলা
গত মাসে উত্তরাখণ্ডে ১৮ বছর বয়সী কাশ্মীরি শাল বিক্রেতা তাবিশ আহমদ গানির ওপর লোহার রড দিয়ে হামলার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ভিডিওতে হামলাকারী এক দোকানদারকে বলতে শোনা যায়, ‘এটি হিন্দু গ্রাম। কাশ্মীরি মুসলমানরা এখানে কাজ করতে পারবে না।’মাথায় ১২টি সেলাই ও হাতে আঘাত পাওয়া গানি বর্তমানে হাঁটতেও পারছেন না।কাশ্মীরের কুপওয়ারা জেলায় নিজ বাড়িতে আলজাজিরাকে তিনি বলেন, ‘আমি কিছু করিনি। শুধু কাশ্মীরি মুসলমান পরিচয়ের কারণেই আমাকে মারধর করা হয়েছে।’শুধু এই ঘটনাই নয়, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে কাশ্মীরি শিক্ষার্থী, শাল বিক্রেতা ও অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর প্রায় ২০০টি হামলার অভিযোগ উঠেছে। অনেককে মারধর, হুমকি ও এলাকা ছাড়তে বাধ্য করার ঘটনা ঘটেছে।
স্লোগান না দেওয়ায় মারধর
উত্তরাখণ্ডের কাশীপুরে বড়দিনের দিন বিলাল আহমদ নামের এক শাল বিক্রেতাকে ‘ভারত মাতা কি জয়’ স্লোগান দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় একদল ব্যক্তি মারধর করে বলে অভিযোগ।
ঘটনার পর পরিবারের চাপে তিনি ব্যবসা গুটিয়ে কাশ্মীরে ফিরে যান।কাশ্মীরে দীর্ঘদিন ধরেই কর্মসংস্থানের সংকট প্রকট। ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের সিদ্ধান্তে অঞ্চলটির আংশিক স্বায়ত্তশাসন বাতিলের পর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আরো বেড়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। ফলে অনেক তরুণ জীবিকার তাগিদে পাঞ্জাব, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, হরিয়ানা ও দিল্লিসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মৌসুমি ব্যবসায় যুক্ত হন।তবে গত বছর পেহেলগামে পর্যটকদের ওপর হামলার পর কাশ্মীরিদের বিরুদ্ধে সন্দেহ ও বিদ্বেষের মাত্রা বেড়েছে।
হয়রানির ধারাবাহিকতা
পাঞ্জাবের মোগা জেলায় শাল বিক্রি করতে গিয়ে বশির আহমদকে ‘অনুমতিপত্র’ দেখাতে বলা হয়। দেখাতে না পারায় তাকে গালিগালাজ করে পণ্য ছুড়ে ফেলা হয়। পরে তিনি কাশ্মীরে ফিরে যান।হিমাচল প্রদেশের কাংড়া জেলায় অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য সুরজিত রাজপুত গুলেরিয়া এক কাশ্মীরি ফেরিওয়ালাকে ফেসবুক লাইভে অপমান করেন। স্থানীয় পুলিশ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ নিলেও পরবর্তী কোনো পদক্ষেপের তথ্য পাওয়া যায়নি। কয়েক দিন পর আবারও একই ধরনের ঘটনার অভিযোগ ওঠে।পাঞ্জাবের জলন্ধরে ফলের ব্যবসা করতেন আবদুল হাকিম। হুমকি পাওয়ার পর তিনি প্রায় এক লাখ রুপির ফল ফেলে রেখে কাশ্মীরে ফিরে যান। তার মা মিসরা বেগম বলেন, ‘ছেলের নিরাপত্তা আগে। না খেয়ে থাকব, তবু বিপদে ফেলব না।’
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ হামলাগুলোকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি উত্তর ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি তুলেছেন বলে জানান।
পিডিপি নেত্রী মেহবুবা মুফতি সামাজিক মাধ্যমে অভিযোগ করেন, কিছু রাজ্যে ‘নীরব পৃষ্ঠপোষকতা’ থাকায় উসকানিমূলক রাজনীতি মাথাচাড়া দিচ্ছে। অন্যদিকে বিজেপির কাশ্মীর শাখার মুখপাত্র আলতাফ ঠাকুর হামলাকে ‘ভুল ও অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে বলেন, কাশ্মীরিরা দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং সরকার এমন কর্মকাণ্ড সহ্য করবে না। কমিউনিস্ট নেতা ও বিধায়ক মোহাম্মদ ইউসুফ তারিগামি বলেন, ‘ছোট ব্যবসায়ী ও শাল বিক্রেতারা জীবিকার জন্য বাইরে যান। কিন্তু ধারাবাহিক হামলা ও ভীতি তাদের মধ্যে গভীর অনিরাপত্তা তৈরি করছে। এটি একটি উদ্বেগজনক ধারা।’নিরাপত্তাহীনতার এই বাস্তবতায় কাশ্মীরি ব্যবসায়ীরা এখন একে অন্যের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। আয়াজ আহমদের ভাষায়, এখন ব্যবসার চেয়ে বড় প্রশ্ন—‘নিরাপত্তা’।

