এক দিন আগেই আমরা মহান একুশে ফেব্রুয়ারি এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করেছি। ১৯৫২ সালের এই দিনে আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভাষা বাংলার সম্মান রক্ষায় বাংলার তরুণরা বুকের তাজা রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করেছিলেন। তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সারা দেশে শহীদ মিনারগুলোতে মানুষের ঢল নেমেছিল। সশ্রদ্ধ চিত্তে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে।
নিজ নিজ মাতৃভাষার প্রতি আমাদের মতোই একই রকম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রয়েছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর মানুষেরও। কিন্তু তাদের মাতৃভাষার কী অবস্থা, তাদের সংস্কৃতির কী অবস্থা, সে বিষয়গুলো আমরা ভেবে দেখছি কি? রাষ্ট্র কি সেসব মানুষের মাতৃভাষাকে যথাযথ সম্মান দিচ্ছে? তাদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে কি যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছে? আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে এ প্রশ্নগুলোও স্বাভাবিকভাবেই এসে পড়ে।
২০১৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ২০২২ থেকে ২০৩২ সাল পর্যন্ত ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী ভাষা দশক’ পালনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। এই দশক পালনের লক্ষ্য হচ্ছে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিপণ্ন ভাষাগুলোকে টিকিয়ে রাখা, তাদের সামাজিক-সাস্কৃতিক জীবনের স্বাতন্ত্র্যকে সমুন্নত রাখা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সবার সমান ভাষিক অধিকার নিশ্চিত করা। দশকের চতুর্থ বছর পার করছি আমরা। কিন্তু এর মধ্যে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর ভাষা এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক উন্নয়নে আমরা কতটুকু ভূমিকা রাখতে পেরেছি?
২০২১ সালে বাংলাদেশ সরকার ৫০টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দেয়। তাদের মধ্যে স্বল্প পরিচিত ২০টি জনগোষ্ঠীর ভাষা নিয়ে গবেষণার কাজ শুরু করে আন্তর্জাতিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সামার ইনস্টিটিউট অব লিঙ্গুইস্টিকস (এসআইএল) ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে স্বল্প পরিচিত ১৫টি জনগোষ্ঠীর ওপর গবেষণা শেষ করে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিবেদনে জানা যায়, গবেষণার তৃতীয় ও শেষ পর্বে ২০২৪ সালে পাঁচটি জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও আর্থ-সামাজিক অবস্থা নিরূপণ করে এসআইএল, যা গত বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশ করা হয়। এগুলো হলো—গড়াইত, গুর্খা, খেড়োয়ার, ভূঁইমালী, লোহার ও শবর। গবেষণায় দেখা গেছে, মূলত অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে অনগ্রসরতার কারণে মাতৃভাষা গুরুত্ব পাচ্ছে না এসব সমপ্রদায়ের লোকদের কাছে। জীবিকার তাগিদেই তারা ঝুঁকছে বাংলা বা অন্য ভাষার দিকে। এসব জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগই দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে এবং ভূমিহীন। শিক্ষার চিত্রও একই রকম করুণ। একটি বড় অংশ প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ করে। প্রাথমিকের গণ্ডি পার হলেই লক্ষণীয়ভাবে বেড়ে যায় ঝরে পড়ার হার। উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে। গবেষণায় উঠে এসেছে, ভাষার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর নিজস্ব সংস্কৃতি ও জীবনযাপনের উপাদানও। খেড়োয়ার জনগোষ্ঠীর ৯৪ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তাঁরা তাঁদের নিজস্ব বা ঐতিহ্যবাহী আসবাব সম্পর্কে জানেন না। গড়াইত সম্প্রদায়ের মাত্র ১৯ শতাংশ জানিয়েছে, তাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে অনন্য ঐতিহ্যবাহী পোশাক বা অলংকারের উপস্থিতি রয়েছে। লোহার জনগোষ্ঠীর মাত্র ১৬ শতাংশ সদস্য তাঁদের নিজস্ব বাদ্যযন্ত্র সম্পর্কে জানেন।
পৃথিবীর সব দেশই বৈচিত্র্যকে মূল্য দেয়। নিজের অধিকারের পাশাপাশি অন্যের অধিকারকেও সম্মান জানায়। বাংলাদেশেও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর ভাষা ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনকে এগিয়ে নিতে হবে। শিক্ষাবিদদের মতে, প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা মাতৃভাষায় না হলে শিক্ষা গভীরতা পায় না। তাই নৃগোষ্ঠীগুলোর শিশুদের শিক্ষা মাতৃভাষায় আয়োজনে গুরুত্ব দিতে হবে।

