প্রতিদিনের ডেস্ক:
পাকিস্তানে ক্রমাগত বাড়তে থাকা জঙ্গিবাদের মুখে চীনা বিনিয়োগ ধরে রাখতে বড় ধরনের ছাড় দিতে বাধ্য হচ্ছে ইসলামাবাদ। জানুয়ারির শুরুতে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি চীনা নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য একটি বিশেষ নিরাপত্তা ইউনিট গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। বছরের পর বছর ধরে চীনা শ্রমিক ও অবকাঠামো প্রকল্পের ওপর বিচ্ছিন্নতাবাদী ও উগ্রপন্থি গোষ্ঠীর প্রাণঘাতী হামলার প্রেক্ষাপটে এই নজিরবিহীন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ডিপ্লোম্যাট এ খবর জানিয়েছে।বিশ্লেষকদের মতে, নিজের প্রধান পৃষ্ঠপোষক বেইজিংকে তুষ্ট রাখতে পাকিস্তান এখন চরম মরিয়া। অন্যদিকে, ইসলামাবাদের এই দুর্বল অবস্থানের সুযোগ নিয়ে দেশটিতে নিজের প্রভাব ও উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করছে চীন।২০২৬ সালের জানুয়ারির শুরুতে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি জানান, দেশে অবস্থানরত চীনা নাগরিকদের সুরক্ষায় একচেটিয়াভাবে কাজ করবে এমন একটি বিশেষ নিরাপত্তা ইউনিট গঠন করা হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনা নাগরিক, কর্মী ও অবকাঠামো প্রকল্পে ধারাবাহিক হামলার পর এই সিদ্ধান্ত এলো।পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। এই পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ ধরে রাখতে বেইজিংকে সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করছে ইসলামাবাদ। অন্যদিকে ২০২৫ সালের শেষার্ধে কিছুটা পিছু হটার পর এখন পাকিস্তানে নিজেদের উপস্থিতি আরও জোরদার করছে চীন।২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবানের ক্ষমতায় ফেরার পর অঞ্চলটিতে প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করে বেইজিং। যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি কমে যাওয়াকে সুযোগ হিসেবে দেখেছিল তারা। তবে প্রত্যাশিত সুবিধা পাওয়ার বদলে চীনা স্বার্থই জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
পাকিস্তানে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) খাইবার পাখতুনখোয়ায় এবং বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) বেলুচিস্তানে চীনা অবকাঠামো প্রকল্পে হামলা চালিয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আফগানিস্তান ও তাজিকিস্তানেও চীনা নাগরিক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা বেড়েছে।আফগানিস্তানে ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রদেশ (আইএসকেপি) জানিয়েছে, শিনজিয়াংয়ে উইঘুর মুসলিমদের বিরুদ্ধে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ‘অপরাধের’ প্রতিশোধ হিসেবেই তারা চীনা নাগরিকদের লক্ষ্য করছে।টিটিপি চায় পাকিস্তানে চীনের সম্পৃক্ততা নিরুৎসাহিত করতে এবং ইসলামাবাদের সরকারকে অকার্যকর প্রমাণ করতে। অন্যদিকে বিএলএ মনে করে, বেলুচিস্তানের সম্পদ স্থানীয় জনগণের বদলে রাষ্ট্রের স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে, যার অংশ চীনা প্রকল্পগুলো।দুই দেশের ‘লৌহ ভ্রাতৃত্ব’ সম্পর্কের মধ্যেও নিরাপত্তা প্রশ্নটি দীর্ঘদিনের অস্বস্তির বিষয়। চীনা কমিউনিস্ট পার্টি বারবার নিরাপত্তা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে। ২০২৪ সালের জুনে নতুন সামরিক অভিযান শুরু হলেও সামগ্রিক সহিংসতা কমেনি। বরং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের অভিযোগ ওঠে।৩১ জানুয়ারি বিএলএ’র সমন্বিত আত্মঘাতী হামলা ও গুলিতে বেলুচিস্তানে বহু পুলিশ ও সেনা সদস্য নিহত হন। এই ঘটনা পাকিস্তানের নিরাপত্তা সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করে।এই প্রেক্ষাপটে চীন নিজস্ব সশস্ত্র নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েনের অনুমতি চেয়েছিল। এমনকি গোয়াদার বন্দরে স্থায়ীভাবে সেনা মোতায়েনের প্রস্তাবও দেয়। তবে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ইসলামাবাদ এতে অনীহা দেখায়।‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে’ যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্ত অতিক্রম করে পাকিস্তানের ভেতরে অভিযান চালিয়েছে। সে সময় মার্কিন কূটনীতিকদের অস্ত্র বহনের ঘটনাও সামনে আসে। তবু চীনা নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা এবং নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েনে আপত্তি, এই দ্বৈত অবস্থান বেইজিংয়ের জন্য বিরক্তির কারণ হয়ে আছে।চীনা নাগরিকদের জন্য আলাদা ইউনিট গঠন এখন পর্যন্ত বেইজিংয়ের দাবির প্রতি ইসলামাবাদের সবচেয়ে বড় ছাড়। এতে কার্যত চীনা কর্মীরা পাকিস্তানের সাধারণ নাগরিকদের চেয়ে অগ্রাধিকার পাচ্ছেন। অথচ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানি নাগরিকেরাও লাগাতার জঙ্গি হামলার শিকার।২০২৫ সালের মার্চে কুয়েটা থেকে পেশোয়ারগামী একটি ট্রেন ছিনতাই করে বিএলএ। প্রায় ৪৫০ যাত্রী ছিলেন ট্রেনে। সেনাবাহিনী সময়মতো পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারায় বহু বেসামরিক মানুষ নিহত হন।প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আগেই বলেছেন, দেশের বিমানবন্দরগুলোতে চীনা নাগরিকদের অগ্রাধিকারভিত্তিক নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে। ফলে বিদেশিদের জন্য বাড়তি নিরাপত্তা ব্যাখ্যা করা রাজনীতিবিদদের জন্য কঠিন হবে।নতুন উদ্যোগে পাকিস্তান ও চীনের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা এবং সন্ত্রাসী সংগঠনের তৎপরতা নিয়ে তথ্য আদান-প্রদানের ধারা রাখা হয়েছে। এতে ভবিষ্যতে চীনের সরাসরি সন্ত্রাসবিরোধী সম্পৃক্ততার পথও খুলে যেতে পারে।দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতায় অদক্ষতা ও প্রতারণার অভিযোগ করেছে। একই পথে হাঁটলে চীনও অনুরূপ হতাশায় পড়তে পারে। তবু ৬২ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ সুরক্ষায় বেইজিংয়ের বিকল্প সীমিত।তবে নতুন এই উদ্যোগ বাস্তবে পরিস্থিতির কতটা পরিবর্তন আনবে, তা স্পষ্ট নয়। পাকিস্তান বহুদিন ধরেই হুমকির গুরুত্ব বোঝে এবং সামরিক ও নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বাড়িয়েছে। সমস্যা ইচ্ছার ঘাটতি নয়, সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা।তবু একটি বিষয় স্পষ্ট যে, চীন এখনই পাকিস্তান ছাড়তে প্রস্তুত নয়। আরব সাগরে অবাধ প্রবেশাধিকার ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সুবিধা বেইজিংয়ের কাছে মানবিক ও আর্থিক ব্যয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।যদি এই বিশেষ নিরাপত্তা ইউনিট চীনা নাগরিকদের সুরক্ষায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখাতে না পারে, তবে ইসলামাবাদের সামনে বিকল্প কমে যাবে। তখন নিরাপত্তার দায়িত্ব আউটসোর্স করে তথাকথিত ‘সব সময়ের’ অংশীদারের কাছে আরও সার্বভৌমত্ব ছাড়তে হতে পারে পাকিস্তানকে।

