যুদ্ধের প্রভাব তীব্র হচ্ছে

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের নানামুখী প্রভাব পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। গ্যাস ও জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেছে। তদুপরি সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। জ্বালানির অভাবে শিল্প-কারখানায় উৎপাদন কমে যাচ্ছে। পণ্য পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে। ক্রমেই বাড়ছে মূল্যস্ফীতি। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তার নানামুখী প্রভাব ক্রমেই আরো তীব্র হবে। এই যুদ্ধের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে জ্বালানির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর ওপর।
বাংলাদেশেও প্রভাব ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
দেশে অনেক দিন ধরেই গ্যাসের সংকট চলছে। চার হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যেত দুই হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘন ফুটের মতো। এর মধ্যে এলএনজি থেকে আসত ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো। তাতেই অনেক শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন নেমে যেত সক্ষমতার অর্ধেকে। বাংলাদেশ এলএনজি আনে মূলত মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এখন সেটি ব্যাহত হলে সংকট অনেক বেড়ে যাবে। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ আপাতত নেই। তাই বাংলাদেশকে বিকল্প উৎস থেকে দ্রুত পর্যাপ্ত এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নিতে হবে।তা না হলে এই সংকট আরো অনেক সংকটের জন্ম দেবে।
গতকাল প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে বছরে ইউরিয়া সারের প্রয়োজন হয় ২৬ লাখ টন। এর মধ্যে দেশে উৎপাদন হয় ১০ লাখ টন এবং আমদানি করতে হয় বাকি ১৬ লাখ টন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি ইউরিয়া কারখানায় এরই মধ্যে গ্যাসের অভাবে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সামনে সারের বড় সংকট তৈরি হতে পারে। আর সেটি হলে তার বড় প্রভাব পড়বে কৃষিতে। খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। বাংলাদেশে বিদ্যুতের একটি বড় অংশ উৎপাদিত হয় গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে। গ্যাসের সংকট বিদ্যুৎ সংকটেরও কারণ হতে পারে। আবার বিদ্যুৎ ও ডিজেলের অভাবে সেচের সংকট বড় হয়ে দেখা দিতে পারে। রান্নাবান্না ও অন্যান্য কাজে এরই মধ্যে মানুষের ভোগান্তি অনেক বেড়ে গেছে। এদিকে দেশের তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মজুদ জ্বালানি দিয়ে সর্বোচ্চ আগামী ১০ এপ্রিল পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন চালানো সম্ভব বলে জানিয়েছে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন (বিআইপিপিএ)। সংগঠনটি বলেছে, সরকারের কাছে তাদের বকেয়া এরই মধ্যে ১৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এই অবস্থায় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে যাবে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, ‘যুদ্ধ পরিস্থিতি অনিশ্চিত থাকায় জ্বালানি তেলের রেশনিং ব্যবস্থা যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত চালু থাকবে।’ আপাতত বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানান মন্ত্রী। সেটি অন্তত এই মুহূর্তে কিছুটা হলেও স্বস্তির কারণ হবে। কিন্তু ভর্তুকির পরিমাণ আরো অনেক বেড়ে যাবে। সেই চাপ সরকার কতটা নিতে পারবে তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারকে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। মালয়েশিয়া কিংবা এশিয়ার উৎসগুলো থেকে এলএনজি সংগ্রহ বাড়াতে হবে। কয়লার আমদানি বাড়িয়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সর্বোচ্চ উৎপাদন ক্ষমতা কাজে লাগাতে হবে। নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়াতে হবে। আমরা আশা করি, সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হবে।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়