১০ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ২৩শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

পুনঃখননের উদ্যোগে আশা জাগাচ্ছে উলাশী-যদুনাথপুরের মৃত ‘জিয়া খাল’

সুন্দর সাহা
সাড়ম্বরে তিনি এলেন, খাল কাটলেন। জয় করলেন সব শ্রেণিেপেশার মানুষের মন। আকাশ ফুড়ে হেলিকপ্টার এলো। তিনি হেলিকপ্টার থেকে নেমে এগিয়ে গেলেন খালের দিকে, সঙ্গে সেনাবাহিনীর অনেক উচ্চ পদস্থ অফিসার। তার পরনে সামরিক পোষাক। হাতে ছড়ি। ছড়ি রেখে হাতে তুলে নিলেন কোদাল, কাটলেন মাটি। ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর যশোরের শার্শা উপজেলার বেতনা নদীর উলাশী অংশে কোদাল হাতে মাটি কাটেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীরউত্তম। সেদিনের সেই দৃশ্য সাধারণের মাঝে এক অভূতপূর্ব প্রেরণার সঞ্চার করে। সেদিন তিনি দীর্ঘ ১৬ মাইল পথ হেঁটে সাধারণ মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ব্যাখ্যা করেছিলেন ভবিষ্যতে এই খালের উপকারের কথা। বোঝাতে থাকেন এই খাল খনন হলে সামনে কী হবে। উপকার হয়েছিল বটে, হয়েছিল সবুজ বিপ্লবও। কিন্তু সেদিনের সেই উপকারভোগীরাই গিলে খেয়েছে সেই জিয়া খাল। যা আজ পুরোপুরি মৃত। মুছতে বসেছে চিহ্নটুকুও। সেসময় এটি ‘উলাশী-যদুনাথপুরের বেতনা নদী সংযোগ প্রকল্প’ নামেও পরিচিত ছিল। তবে এই খালটি স্থানীয়ভাবে ‘জিয়া খাল’ নামেই পরিচিতি লাভ করে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত যশোরের শার্শা উপজেলার উলাশী-যদুনাথপুর খালটি আজ এক অতীত। এক সময় এই খালের স্বচ্ছ পানি শার্শা উপজেলার হাজার হাজার কৃষকের মুখে হাসি ফোটায়। উত্তর শার্শার সোনামুখি ও বনমান্দারসহ ২২টি বিলের হাজার হাজার একর জমিতে পানি নিষ্কাশিত হতো এ খাল দিয়ে। উলাশীর ‘জিয়া খাল’ শার্শার ১১টি ইউনিয়নের ১৭২ গ্রামের সাধারণ মানুষের গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিপ্লব ঘটায়। জিয়াউর রহমানের ডাকে হাজার হাজার মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কোদাল-ঝুড়ি নিয়ে খাল খননে ঝাঁপিয়ে পড়েন, খাল খননে অংশ নেন। অর্ধশত বছরের সেই ঐতিহাসিক ‘জিয়া খাল’ আজ অস্তিত্ব সংকটে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় ধ্বংস হয়ে গেছে উলাশী জিয়া মঞ্চও। এমনকি তিনি যে ঘরে রাতযাপন করেছিলেন সে ঘর আজ অস্তিত্বহীন। গত ৫০ বছরে কেউ খোঁজ নেয়নি এ খাল, মঞ্চ ও ঘরের। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খাল খননের ঘোষণায় এ খালটি ফের আলোচনায় এসেছে। যশোরের উলাশী ‘জিয়া খাল’সহ মৃতপ্রায় ২০টি খাল খনন করবে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এরই মধ্যে তালিকা প্রস্তুত ও সম্ভাব্য ব্যয় নিরূপণ করে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতি বিজড়িত শার্শার উলাশী খাল খননের মধ্যে দিয়ে এ কার্যক্রম শুরু করবে পাউবোর যশোর কার্যালয়। আগামী ১ এপ্রিল এ খালটি খনন করতে স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
পাউবোর কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে ১৯৭৬ সালে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছিলেন। খাল খনন হওয়ায় সেসময় সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, পানি নিষ্কাশন ও খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। সেই চিন্তা থেকে বিএনপি এবার নির্বাচনে সারা দেশে খাল খননের প্রতিশ্রুতি দেয়। প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ শুরু করে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়। মৃতপ্রায় খালের তালিকা চায় মাঠ পর্যায়ে। নির্দেশ অনুযায়ী যশোরের তালিকা আগেই মন্ত্রণালয়ে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পাউবোর যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী। এবার যশোরের শার্শা উপজেলার চার কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের উলাশী খাল, চার দশমিক ২৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের আমলাই সেতাই খাল ও পাকশিয়া খালের তিন কিলোমিটার অংশ খনন করা হবে।
শার্শা উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক উলাশীর শহিদুল ইসলাম শহিদ বলেন, খাল খনন কাজ চলাকালীন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান খালের পাড়েই একটি সাধারণ ভবনে রাত্রীযাপন করেন বলে আমরা । সেই ভবনটি এখন পরিত্যক্ত। শহীদ জিয়ার ব্যবহৃত ফ্যান, খাট, টেবিল, চেয়ারসহ মূল্যবান স্মৃতিচিহ্ন লুট হয়ে গেছে। সেখানে এখন কেবল পড়ে আছে ভাঙা দেওয়াল আর আগাছা। খালের পাড়ে নির্মিত ঐতিহাসিক ‘জিয়া মঞ্চ’ও বিলুপ্তির পথে। যেখানে এক সময় উন্নয়নের শপথ নেওয়া হতো। সেই মঞ্চের একদিকে গড়ে তোলা হয়েছে গুচ্ছগ্রাম। অপরদিকে উলাশী ইউনিয়ন ভূমি অফিস। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী জানান, স্থানীয় জনগণের অসচেতনতা এবং আত্মকেন্দ্রিকতাই খাল হারানোর মূল কারণ। নদ-নদী দখল করে স্থাপনা নির্মাণ এখানকার নিত্যদিনের সমস্যা। শুকনো মৌসুমে অনেক খালে পানি থাকে না, আবার অনেক খাল সংস্কারের অভাবে মৃতপ্রায়। খালগুলো বর্ষায় পানি পেয়ে কিছুটা প্রাণ ফিরে পায়, তবে মানুষ যদি নিজেরা খাল রক্ষায় ভূমিকা না নেয়, তাহলে সেটি টিকিয়ে রাখা কঠিন। তিনি আরও জানান, সম্প্রতি পানি উন্নয়ন বোর্ড যশোরের গুরুত্বপূর্ণ ২০টি খাল খননের উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী ১ এপ্রিল উলাশী খাল খননের মধ্য দিয়ে পুনরায় খনন করা হবে ‘জিয়া খাল’সহ যশোরের সব খাল।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়