বাংলাদেশে দীর্ঘদিন প্রকৃত অর্থে সংসদ কার্যকর ছিল না। পদে পদে গণতন্ত্রের যাত্রা ব্যাহত হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশ পুনরায় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে। এর ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রপতির ভাষণ ঘিরে প্রথম দিনই সংসদ ছিল উত্তপ্ত। সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতির ভাষণকে স্বাগত জানালেও বিরোধীদলীয় সদস্যরা বিক্ষোভ করেন। সংবিধানের ৭৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিবছর সংসদের প্রথম অধিবেশন ও সাধারণ নির্বাচনের পর প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই বিধান মেনে নতুন সরকারের প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
কিন্তু রাষ্ট্রপতির ভাষণের শুরুতেই বিক্ষোভ করেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা। এক পর্যায়ে তাঁরা ওয়াক আউট করেন। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব নিয়ে ৫০ ঘণ্টা আলোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংসদের কার্যনির্বাহী কমিটি। গত রবিবার ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
আলোচনায় সরকারি দলের সদস্যরা রাষ্ট্রপতির ভাষণকে স্বাগত জানালেও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোটের সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহবান না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এই প্রেক্ষাপটে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধান অনুযায়ী ‘সংস্কার পরিষদ’ বলে কিছু নেই। জুলাই সনদে সংস্কার পরিষদের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু তা বাস্তবায়নের আগে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। বিষয়টি নিয়ে সংসদ অধিবেশনের শুরু থেকেই সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতবিরোধ চলে আসছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি জামায়াতসহ বিরোধীদলীয় সদস্যরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিয়েছেন। কিন্তু সরকারদলীয় ও স্বতন্ত্র সদস্যরা সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। এখন বিরোধীরা রাজপথে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। কার্যত দেখা যাচ্ছে, বিরোধী জোটের সদস্যরা কখনো সংবিধান মানেন, আবার কখনো মানতে চান না। সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধান পরিবর্তনের সুযোগ নেই। তাঁর কথায়, ‘রাষ্ট্র ইমোশন দিয়ে চলে না, চলে সংবিধান ও আইন দিয়ে। জনরায়কে অবশ্যই সম্মান দিতে হবে, তবে তা হতে হবে সাবিধানিক উপায়ে।’
আমরাও তা-ই মনে করি, সংসদে যা হবে, তা সব সময় সংবিধান মেনেই হতে হবে। এমনকি সংবিধান পরিবর্তন করতে চাইলেও, তা-ও সংবিধান মেনেই করতে হবে। দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা অব্যাহত রাখতে, সংসদ প্রাণবন্ত ও কার্যকর রাখতে আর কোনো বিকল্প পন্থা নেই। কাজেই স্বল্প সময়ে আলোচনার মাধ্যমে চলমান টানাপোড়েন দূর হোক, এটাই কাম্য।

