মেহেরপুর প্রতিনিধি
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাঁথার অন্যতম স্মৃতিবিজড়িত স্থান ‘মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স’ যেন নিজেই ইতিহাসের ক্ষতচিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছে। ভাঙচুর ও অবহেলায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনাটি, যার ফলে দিন দিন কমে যাচ্ছে দর্শনার্থীর সংখ্যা। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, এক সময়ের প্রাণচঞ্চল কমপ্লেক্স এলাকা এখন প্রায় জনশূন্য। প্রবেশমুখে লোহার ব্যারিকেড দিয়ে ঘেরা ভাস্কর্যগুলো ভাঙা ও বিকৃত অবস্থায় পড়ে আছে। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিলের ঐতিহাসিক শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের দৃশ্য তুলে ধরা ভাস্কর্যগুলোর বহু অংশ নষ্ট হয়ে গেছে। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের প্রতিকৃতির হাত ভেঙে ফেলা হয়েছে, আনসার সদস্যদের রাইফেলও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণের আদলে নির্মিত ভাস্কর্যটি। দুর্বৃত্তরা সেটি ভেঙে ফেলে এবং পরে স্থানচ্যুত করে দূরে ফেলে রাখে। এছাড়া বাংলাদেশের মানচিত্রভিত্তিক স্থাপনার ভেতরে থাকা প্রায় সাড়ে ৩০০টি ক্ষুদ্র ভাস্কর্য যেগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরের চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল সেগুলোর বেশিরভাগই ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন সেখানে পড়ে আছে ভাঙা অংশ আর মস্তকবিহীন অবয়ব। স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে দুই দফা হামলায় এই ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সংস্কারের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থেকে আসা দর্শনার্থী আবু জাফর বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার জন্য এসেছিলাম, কিন্তু সবকিছু এলোমেলো দেখে হতাশ হয়ে ফিরতে হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা সোহানুর রহমান জানান, আগে এখানে মানুষের ঢল নামত, মেলা বসত। এখন ভাঙাচোরা ছাড়া কিছুই নেই, তাই দর্শনার্থীও আসে না। কমপ্লেক্সের নিরাপত্তায় নিয়োজিত আনসার সদস্য আবুল হাসেম জানান, তারা দায়িত্ব নেওয়ার আগেই ভাঙচুর হয়েছে, কিন্তু এখনো কোনো সংস্কার কাজ শুরু হয়নি। মেহেরপুর গণপূর্ত বিভাগের প্রকৌশলী জামাল উদ্দিন বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা ও বরাদ্দ পেলে দ্রুত সংস্কার কাজ শুরু করা হবে। জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এই স্মৃতিস্তম্ভের এমন করুণ অবস্থা স্থানীয়দের মনে ক্ষোভ ও বেদনার জন্ম দিয়েছে। দ্রুত সংস্কার করে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধকে তার আগের রূপে ফিরিয়ে আনার জোর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী ও সচেতন মহল।

