৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

সরাসরি এসআই নিয়োগে ৮৩ বছরের পুরনো প্রবিধান সংশোধন চায় পুলিশ

প্রতিদিনের ডেস্ক:
তদবির ও প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় দ্রুত ৪ হাজার সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) নিয়োগ দিতে ৮৩ বছর আগের ‘পুলিশ রেগুলেশন্স অব বেঙ্গল (পিআরবি)’ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। আধুনিক ও বহুমাত্রিক অপরাধ দমনে দক্ষ জনবল তৈরি এবং অনলাইনে জিডি-মামলার তদন্ত কার্যক্রমকে আরও দ্রুত করতে ১৯৪৩ সালের এই প্রবিধানমালার সংশ্লিষ্ট ধারা সংশোধনের আবেদন জানিয়ে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবিত এই সংশোধনীর মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও যুগোপযোগী ও জনবান্ধব করতে চায় বাংলাদেশ পুলিশ।
পুলিশ সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, পূর্বে সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) নিয়োগ প্রক্রিয়া বিভাগীয় পদোন্নতি ও সরাসরি, এই দুই পদ্ধতিতে সম্পন্ন হতো। এতে নিয়োগ প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক তদবির এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির (ভিআইপি) সুপারিশ বা ‘ডিও লেটার’ সামলাতে গিয়ে পুলিশকে নানা প্রশাসনিক জটিলতার সম্মুখীন হতে হতো।
কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা, পিআরবি সংশোধিত হলে সরাসরি নিয়োগের পথ সুগম হবে; যা সময় সাশ্রয়ের পাশাপাশি নিয়োগ প্রক্রিয়াকে তদবিরমুক্ত ও সহজ করবে।
যৌক্তিকতা তুলে ধরে এসআই পদে সরাসরি নিয়োগের জন্য পুলিশ রেগুলেশন্স অব বেঙ্গল (পিআরবি)-এর সংশ্লিষ্ট ধারাটি সংশোধনের একটি খসড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সরকার সেটি অনুমোদন করলে সরাসরি নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবেপুলিশ সদর দপ্তরের লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্স শাখার অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান
প্রবিধান সংশোধনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে জরুরি ভিত্তিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পুলিশ সদর দপ্তরের লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্স শাখার অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান।
ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, যৌক্তিকতা তুলে ধরে এসআই পদে সরাসরি নিয়োগের জন্য পুলিশ রেগুলেশন্স অব বেঙ্গল (পিআরবি)-এর সংশ্লিষ্ট ধারাটি সংশোধনের একটি খসড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সরকার সেটি অনুমোদন করলে সরাসরি নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, পুলিশকে যুগোপযোগী ও বাস্তবিক অর্থে জনবান্ধব বাহিনীতে পরিণত করতে বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এসব নির্দেশনার আলোকেই নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। ইতোমধ্যে শূন্যপদে জনবল নিয়োগসহ নতুন সৃষ্টি করা পদের বিপরীতে নিয়োগের কার্যক্রম শুরু করেছে পুলিশ সদর দপ্তর।
চার হাজার এসআই নিয়োগের বিষয়ে তিনি বলেন, ৪ হাজার এসআই নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রথমবারের মতো সরাসরি ও দ্রুত নিয়োগ সম্পন্ন করতেই পিআরবি’র সংশ্লিষ্ট ধারা সংশোধন আবশ্যক।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে প্রবিধান সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, দেশের অভ্যন্তরীণ অপরাধ দমন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং ফৌজদারি মামলার তদন্তের মূল দায়িত্ব বাংলাদেশ পুলিশের ওপর ন্যস্ত। তবে বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বহুমাত্রিক সাইবার অপরাধের হারও প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে আগাম তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদ, উগ্রবাদ, মাদক ও বিভিন্ন সংগঠিত অপরাধ (অর্গানাইজড ক্রাইম) দমন করতে দক্ষ পুলিশি জনবল নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। পুলিশকে একটি জনবান্ধব ও যুগোপযোগী বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সক্ষমতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে থানায় অনলাইনে জিডি ও মামলা রুজু করা, তদন্ত কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন, প্রকৃত অপরাধী শনাক্তকরণ এবং জনহয়রানি বন্ধে ৪ হাজার এসআই (নিরস্ত্র) পদে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। আর এই লক্ষ্যেই প্রচলিত ‘পুলিশ রেগুলেশন্স, ১৯৪৩’-এর প্রবিধান ৭৪১(বি) অধিকতর সংশোধন করা প্রয়োজন।
প্রবিধান ৭৪১(বি)-এর প্রস্তাবিত সংশোধনী
প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী, সাব-ইন্সপেক্টর পদের শূন্যপদগুলো বছরে একবার পূরণ করা হবে। এর মধ্যে ৫০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগ এবং বাকি ৫০ শতাংশ সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) পদ থেকে পদোন্নতির মাধ্যমে সম্পন্ন হবে। প্রতি বছরের আগস্ট মাসে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) সব ইউনিট থেকে ওই বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সম্ভাব্য স্থায়ী শূন্যপদের তথ্য সংগ্রহ করবেন। সরাসরি নিয়োগের পদগুলো জনসংখ্যার ভিত্তিতে জেলাওয়ারি বণ্টন করা হবে।
তবে বিশেষ শর্ত থাকে যে, জরুরি প্রয়োজনে সরকার উপযুক্ত মনে করলে নবসৃষ্ট পদের ক্ষেত্রে সরাসরি নিয়োগের এই নির্ধারিত হার বা শতাংশ পরিবর্তন করতে পারবে। এছাড়া, আইজিপি পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণযোগ্য শূন্যপদগুলো ইউনিটওয়ারি বরাদ্দ করবেন। এর ধারাবাহিকতায় সব যোগ্য এএসআই-এর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসে একটি বিভাগীয় পরীক্ষার আয়োজন করবে।
প্রবিধান সংশোধনে যেসব যৌক্তিকতা দেখিয়েছে পুলিশ
চিঠির সঙ্গে যুক্ত খসড়ায় ১৯৪৩-এর প্রবিধান ৭৪১(বি) সংশোধনের যৌক্তিকতা হিসেবে পুলিশ বলছে, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সুরক্ষার পূর্বশর্ত হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা। সময়ের বিবর্তনে অপরাধের ধরন, প্রকৃতি ও পদ্ধতিসহ অপরাধ সংগঠনের মাত্রায় পরিবর্তন আসছে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতির ফলে বহুমাত্রিক সাইবার অপরাধের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে।বর্তমানে সাইবার অপরাধের ধরন ও মাত্রা বাড়ছে। ব্যক্তিগত তথ্য চুরি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার ও রাষ্ট্রবিরোধী গুজব ছাড়াও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হ্যাকিং, পর্নোগ্রাফি, সাইবার বুলিং, এমনকি রাষ্ট্রের গোপন তথ্য ফাঁসের মতো ঘটনাগুলো জাতীয় নিরাপত্তা ও সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে।
২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮১ মিলিয়ন ডলার চুরির ঘটনার উদাহরণ দিয়ে পুলিশ বলছে, সাইবার সুরক্ষা এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়, এটি এখন জরুরি প্রয়োজন। খসড়ায় আরও বলা হয়, কিছু ইউনিট সাইবার অপরাধের তদন্তে কাজ করলেও তা অপ্রতুল। রাজধানীর বাইরে বিভাগীয়, জেলা ও থানা পর্যায়ের জনগণ এই সেবা থেকে প্রায়ই বঞ্চিত হচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও সুশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পুলিশের অন্যতম প্রধান কাজ হলো যেকোনো অভিযোগ অনুসন্ধানসহ মামলা ও অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে অনলাইনের মাধ্যমে যেকোনো ব্যক্তি থানায় না গিয়েই জিডি বা মামলা করতে পারেন, এমন সুবিধা প্রবর্তন করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে যথাযথ আইন প্রয়োগ, জিডি অনুসন্ধান, মামলার সুষ্ঠু তদন্ত, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক ও অপারেশনাল কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য যুগোপযোগী ও দক্ষ জনবল থাকা অত্যাবশ্যক।
খসড়ায় আরও উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ পুলিশে বর্তমানে ৬৪টি জেলা পুলিশ, ৮টি রেঞ্জ পুলিশ, ৮টি মেট্রোপলিটন পুলিশ, সিআইডি ও পিবিআইসহ বিভিন্ন ইউনিট মামলার তদন্ত কার্যক্রমের সাথে জড়িত। এছাড়া পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোতে অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট, শিল্পাঞ্চল পুলিশ, নৌ-পুলিশ, রেলওয়ে পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ এবং ট্যুরিস্ট পুলিশসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত ইউনিট রয়েছে। এসব ইউনিটের মাধ্যমে দেশের আইনশৃঙ্খলা সমুন্নত রাখা এবং জনগণকে বিশেষায়িত সেবা প্রদানের পাশাপাশি জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। পুলিশের বল প্রয়োগের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদ আবশ্যিকভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে।
সাব-ইন্সপেক্টর নিয়োগের ব্যাপারে খসড়ায় বলা হয়েছে, সাব-ইন্সপেক্টর (নিরস্ত্র) পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। থানা পর্যায়ে মামলার তদন্ত, অপরাধী শনাক্তকরণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জনগণের সঙ্গে জনসংযোগ ও মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনায় এই পদটি প্রধান ভূমিকা পালন করে। প্রচলিত বিধি অনুযায়ী, সাব-ইন্সপেক্টর (নিরস্ত্র) পদের ৫০ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে এবং ৫০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ করা হয়। বর্তমানে সরাসরি নিয়োগযোগ্য সাব-ইন্সপেক্টর পদের সংখ্যা ১০ হাজার ৫৭৪টি। এই অপ্রতুল জনবল দিয়ে বিশাল কর্মযজ্ঞ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা প্রায় অসম্ভব।
দক্ষ জনবলের অভাবে থানায় অনলাইনে জিডি ও মামলা করা থেকে শুরু করে তদন্ত ও রেকর্ডসহ অনুসন্ধান কার্যক্রম যথাযথভাবে পরিচালনা করা যাচ্ছে না। আধুনিক সময়ে অপরাধের ধরন পরিবর্তনের কারণে অপরাধের প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন ও আসামি গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে হয়। এ ক্ষেত্রে একজন কর্মকর্তার কর্মপরিধি ও তদন্তের ক্ষেত্রে শারীরিক সক্ষমতার পাশাপাশি কৌশলগত জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার বিষয়টি অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
তাই বাংলাদেশ পুলিশকে অধিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, জনবান্ধব ও গ্রহণযোগ্য শৃঙ্খলা বাহিনী হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সততা, দক্ষতা, ব্যক্তিত্ব, স্বাস্থ্যগত সক্ষমতা, পেশাদারিত্ব ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সরাসরি নিয়োগযোগ্য সাব-ইন্সপেক্টরের (নিরস্ত্র) সংখ্যা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এজন্য প্রচলিত নিয়োগবিধি সংশোধন করে প্রজ্ঞাপন জারি করা প্রয়োজন।
প্রবিধান সংশোধন চেয়ে পুলিশের পাঠানো চিঠি ও খসড়ার অনুমোদনের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (পুলিশ-২ শাখা) ফরিদা খানম ঢাকা পোস্টকে বলেন, এসআই সরাসরি নিয়োগে প্রবিধান সংশোধন চেয়ে একটি চিঠি এসেছে বলে শুনেছি। ছুটিতে থাকায় ফাইলের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে বিস্তারিত জানাতে পারব।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়