৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ১৮ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

ইরান যুদ্ধের কবলে ‘কিং অব কেমিক্যালস’

প্রতিদিনের ডেস্ক:
সালফার এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা ওষুধ, কৃষি ও খনিশিল্প সবখানেই ব্যবহার হয়। কিন্তু সাধারণত এটি খবরের শিরোনামে আসে না। তবে ইরান যুদ্ধ দেখিয়ে দিচ্ছে, কেন এই উপাদানটির দিকে বিশ্বকে আরো গুরুত্ব দিয়ে তাকানো উচিত।ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে।
এর প্রভাব পড়ছে সালফারের বাণিজ্যেও।সালফার মূলত তেল ও গ্যাস উৎপাদনের সময় পাওয়া যায়। পরে এটি সালফিউরিক এসিডে পরিণত হয়, যাকে ‘রাসায়নিকের রাজা’ বলা হয়। এই সালফিউরিক এসিড সার উৎপাদন, ধাতু প্রক্রিয়াকরণ এবং ওষুধশিল্পে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।তাই সালফারের বাজারে কোনো সমস্যা হলে তার প্রভাব শুধু এই খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং আরো অনেক শিল্পে ছড়িয়ে পড়ে।
শক্তি উৎপাদনে আধিপত্যের কারণে মধ্যপ্রাচ্য সালফারেরও একটি শক্তিশালী কেন্দ্র। বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্য বাজারসংক্রান্ত তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আর্গাস মিডিয়ার সালফার ও সালফিউরিক এসিড গবেষণা বিভাগের প্রধান মিনা চৌহান বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী মোট সালফার রপ্তানির প্রায় অর্ধেক মধ্যপ্রাচ্য থেকে হয় এবং এর প্রধান গন্তব্যগুলোর মধ্যে রয়েছে চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র।’
কিন্তু ইরান যুদ্ধ এবং এর ফলে হরমুজ প্রণালিতে সৃষ্ট অচলাবস্থা এই প্রবাহকে রুদ্ধ করে দিয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে সরবরাহ শৃঙ্খলকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞ মিনা চৌহান বলেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্ব এত বেশি যে, এখন পরিস্থিতি এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে।’
ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেও সালফারের বাজার বেশ সংকুচিত ছিল। জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির গবেষণা বিশ্লেষক জেমস উইলোবি বলেন, ‘রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসন, সেই সঙ্গে সার খাত এবং ইন্দোনেশিয়ার নিকেল শিল্প থেকে আসা নতুন চাহিদার ফলে দাম তিন-চার বছরের সর্বোচ্চের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল।’ ইরান যুদ্ধের কারণে এই সমস্ত চাপ আরো তীব্র হয়েছে।এই সংঘাত জ্বালানি উৎপাদনকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করায় সালফারের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে।
এই খাতটি এখন এতটাই চাপের মধ্যে পড়েছে যে, দেশগুলো এই ধাক্কা থেকে নিজেদের অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। রয়টার্স জানিয়েছে, তুরস্ক গত সপ্তাহে সালফার রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে এবং ভারতও নিজস্ব রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা ভাবছে। চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় সালফিউরিক এসিড রপ্তানিকারক দেশ। গত বছর বিশ্বে মোট রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশই চীন থেকে গেছে। এই এসিডের প্রধান ক্রেতা দেশগুলোর মধ্যে আছে চিলি, যেখানে তামাশিল্পে এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়ায় দ্রুত বাড়তে থাকা নিকেলশিল্পেও এর চাহিদা বেশি। মরক্কো ও সৌদি আরবও বড় ক্রেতা, কারণ তারা ফসফেট প্রক্রিয়াজাত করতে সালফিউরিক এসিড ব্যবহার করে।
বিশ্লেষকরা বলেছেন, বেইজিংয়ের সম্ভাব্য পদক্ষেপগুলোর লক্ষ্য সম্ভবত বাহ্যিক চাপ থেকে নিজেদের অর্থনীতিকে রক্ষা করা। কলোরাডো স্কুল অব মাইন্সে খনিজ ও জ্বালানি অর্থনীতি নিয়ে গবেষণা করেন সঙ্গীতা গায়ত্রী কান্নান। তিনি বলেন, ‘এই পণ্যটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা আসলে দেশের ভেতরের চাহিদা ও ভোক্তাদের সুরক্ষার জন্যই নেওয়া একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত।’ইরান যুদ্ধের কারণে যে অর্থনৈতিক ধাক্কা তৈরি হয়েছে, তার ওপর আবার বিভিন্ন দেশের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা যোগ হওয়ায় সালফারের দাম আরো বাড়বে এবং বাজারে চাপ বাড়তেই থাকবে। কারণ সালফিউরিক এসিড সহজে অন্য কিছু দিয়ে বদলানো যায় না। তাই মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে যে সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত পূরণ করা কঠিন হবে। ফলে বাজারে সংকট আরো দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞ মিনা চৌহান বলেছেন, বিশ্বের অন্য সব জায়গা থেকে যতই সালফার জোগাড় করা হোক, তবু তা মধ্যপ্রাচ্য থেকে যে পরিমাণ রপ্তানি হয় তার ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়। সালফিউরিক অ্যাসিড সার উৎপাদনের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই সালফারের এই সংকট কৃষি খাতেও বড় চাপ তৈরি করবে। ইরান যুদ্ধের কারণে আগেই কৃষি বাজারে সমস্যা ছিল, এখন সার উৎপাদনের খরচ আরও বেড়ে গেছে। খনিশিল্পেও এর প্রভাব পড়ছে, কারণ খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতে সালফিউরিক অ্যাসিড প্রয়োজন। এশিয়ার ব্যবসায়ীরা এখন বিকল্প উৎস খুঁজতে হিমশিম খাচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ার নিকেল উৎপাদকরাও উৎপাদন কমাতে বাধ্য হতে পারে। যারা মধ্যপ্রাচ্য থেকে বেশি সালফার আমদানি করে।
আইভানহো মাইনসের প্রতিষ্ঠাতা রবার্ট ফ্রিডল্যান্ড বলেছেন, আফ্রিকায় আমদানি করা ৯০ শতাংশের বেশি সালফারই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এখনই ব্যবসায়ীরা সালফার জোগাড় করতে সমস্যায় পড়ছে, ফলে সালফিউরিক অ্যাসিডের দাম বাড়বে। যদি এই সংকট তিন সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়, তাহলে তামা উৎপাদনকারী অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কারণ তাদের কাছে প্রয়োজনীয় অ্যাসিড থাকবে না।
যদি ইরান যুদ্ধ চলতেই থাকে এবং জ্বালানি উৎপাদন ও বৈশ্বিক বাণিজ্য আরো বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সালফারের বড় সংকট তৈরি হতে পারে। এতে অনেক কারখানা উৎপাদন কমাতে বা পুরোপুরি বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন আর শুধু বেশি দাম দিলেই সমস্যা মিটবে না। কারণ যদি বাজারে সালফারই না থাকে, তাহলে টাকা দিয়েও তা পাওয়া যাবে না। ফলে উৎপাদন চালানোই কঠিন হয়ে পড়বে। এ অবস্থায় শিল্প খাতের সামনে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

 

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়