সরকারের দাবি, দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের সর্বোচ্চ মজুদ রয়েছে। গত বছরের সমপরিমাণই তেল সরবরাহ করা হচ্ছে, অথচ পেট্রল পাম্পগুলোতে তেলের জন্য অপেক্ষমাণ যানবাহনের সারি কেবলই দীর্ঘ হচ্ছে। কোথাও কোথাও ১২ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নেওয়ার অভিজ্ঞতার কথাও জানা যাচ্ছে। এমনকি তেলের অভাবে জরুরি সেবার যানবাহনের চলাচলও বিঘ্নিত হচ্ছে।
পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক স্থানে পাম্প কর্মচারীদের সঙ্গে ক্ষুব্ধ গ্রাহকদের হাতাহাতি এবং পাম্পে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটছে। তাহলে এত বিপুল পরিমাণ তেল যাচ্ছে কোথায়? বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সংকটের মূলে রয়েছে তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার কিংবা তেল না পাওয়ার ভয় বা আতঙ্ক। ফলে প্যানিক বায়িং বা আতঙ্কজনিত ক্রয় বেড়ে গেছে। অনেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কিনে ভবিষ্যতের জন্য মজুদ করছেন। আবার মজুদদারি এবং বেশি দামে কালোবাজারে বিক্রির জন্যও তেলের চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। সেই সঙ্গে রয়েছে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে জ্বালানি তেল চোরাচালান বা পাচার হয়ে যাওয়া। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরবরাহ ও বিক্রয় ব্যবস্থাপনা উন্নত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কর্মকর্তারা জানান, দেশে বর্তমানে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেলের মজুদ রয়েছে। গত বছরের সমপরিমাণ তেল সরবরাহ করা সত্ত্বেও পাম্পগুলো থেকে অতিরিক্ত ৩০ শতাংশ চাহিদা দেওয়া হচ্ছে। বিপিসি জানায়, চাহিদার সঙ্গে সমন্বয় করার লক্ষ্যে আজ রবিবার থেকে অকটেনের সরবরাহ ২৫ শতাংশ বাড়ানোর চিন্তা রয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার দাবি করা হলেও বাস্তবে বেশির ভাগ এলাকার পাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও পাম্প পুরোপুরি বন্ধ, কোথাও বা সীমিত পরিসরে বিক্রি চলছে। ফলে সাধারণ মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে। বিভাগগুলো থেকেও প্রায় একই রকম চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। গত শুক্রবার চট্টগ্রাম মহানগরে ৬২টি পেট্রল পাম্পের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ বন্ধ ছিল। পাম্প মালিকরা জানান, সপ্তাহে মাত্র এক দিন জ্বালানি সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। সেই তেলও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে যাওয়ায় বেশির ভাগ সময় পাম্প বন্ধ রাখতে হচ্ছে। বাংলাদেশ পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (একাংশ) সভাপতি নাজমুল হক বলেন, ‘তেলসংকট ঢাকার বাইরেই বেশি। ঢাকার মধ্যেও পাম্প বন্ধ থাকছে। ঢাকার বাইরের অনেক পাম্পে ১৫ দিনে একবার তেল দেওয়া হচ্ছে। প্রায় ৪০ শতাংশ পাম্পে মাসে ১৫ থেকে ২০ দিনে একবার তেল দেওয়া হচ্ছে। রাজধানীতেও ৬০ শতাংশ পাম্পে তেল দেওয়া হচ্ছে, তা-ও গত বছর যা দিয়েছে, সেই হারে দেওয়া হচ্ছে। গত বছরের গাড়ির সংখ্যা আর এই বছরের গাড়ির সংখ্যা তো এক নয়।’
চাহিদামাফিক তেল না পেয়ে গ্রাহকদের দুর্ভোগ বাড়ছে। কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল না পেয়ে অনেকেই মেজাজ হারাচ্ছেন। ঝগড়াঝাঁটি নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। গতকালের পত্রিকায়ও খবর রয়েছে, নাটোরের বড়াইগ্রামে তেল সরবরাহে দেরি হওয়াকে কেন্দ্র করে একটি ফিলিং স্টেশন ভাঙচুর করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অবসান এবং জ্বালানি তেলের স্বাভাবিক সরবরাহের বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত। তা সত্ত্বেও দেশের পরিবহনব্যবস্থাকে সচল রাখা অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে বাজার অস্বাভাবিক হবে। মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে। বিকল্প উৎস থেকে তেল আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি মজুদদারি ও চোরাচালানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

