১৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ৩০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

মহামারি রূপে ছড়িয়ে পড়ছে হাম

সফল টিকাদান কর্মসূচির কারণে হাম দেশ থেকে নির্মূল হওয়ার পথে ছিল। কিন্তু সেই হামই এখন প্রায় মহামারি রূপে ছড়িয়ে পড়েছে। ৬১টি জেলাতেই রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে। গতকাল প্রকাশিত খবরে বলা হয়, এরই মধ্যে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ২৬৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সোমবার পর্যন্ত ৩৩ হাজার ৩৮৬ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ২২ হাজার ৪৪২ শিশু। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সময়ে মহামারি ব্যবস্থাপনার মৌলিক ধাপগুলো খুব দ্রুত কার্যকর করা জরুরি ছিল। কিন্তু সরকারি পর্যায়ে তেমন জোরালো তৎপরতা দেখা যায়নি।এমন পরিস্থিতিতে হাইকোর্ট সারা দেশে অবিলম্বে হামের টিকাসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন। এক রিট আবেদনে প্রাথমিক শুনানির পর বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর বেঞ্চ সোমবার রুলসহ এই আদেশ দেন। অতি সংক্রামক হাম প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে নিষ্ক্রিয়তা ও ব্যর্থতা কেন অবৈধ, স্বেচ্ছাচারী ও আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে রুলে। বাংলাদেশে হামের বর্তমান পরিস্থিতিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে মূল্যায়ন করছে।
একই সঙ্গে টিকার তীব্র ঘাটতি এবং ক্রমবর্ধমান মৃত্যুহার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। দেশের মহামারি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যখন ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে উল্লেখ করে, তা এক অর্থে মহামারিই। এই সময়ে সরকারের উচিত সংকট মোকাবেলায় জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করা।
মহামারি মোকাবেলায় মৌলিক নীতিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ডেঙ্গু বা কভিডের মতো বিজ্ঞানভিত্তিক ক্লিনিক্যাল প্রটোকল তৈরি, যা অনুসরণ করে উপজেলা হাসপাতাল থেকে শুরু করে সকল পর্যায়ে এক অভিন্ন চিকিৎসা প্রদান করা। কিন্তু সরকার এখন পর্যন্ত তা করেনি। এমনকি স্বাস্থ্যকর্মীদের হাম ব্যবস্থাপনায় কোনো বিশেষ ওরিয়েন্টেশন বা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি।
অন্য ধাপগুলোর মধ্যে রয়েছে জনস্বাস্থ্য নজরদারির মাধ্যমে রোগের বিস্তার ও ধরন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে বিধি-নিষেধ আরোপ করা। আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করতে ব্যাপক পরীক্ষা, সংক্রমিতদের আইসোলেশন এবং সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টাইনে রাখা। হাসপাতালে আইসিইউ, পিআইসিইউ ও অক্সিজেন সরবরাহ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী নিশ্চিত করা। এর বাইরে অতি গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি ধাপ হলো ‘ডেথ রিভিউ’ বা মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ, যার মাধ্যমে কোথায় ঘাটতি রয়েছে, তা নির্ণয় করাও সহজ হয়। এসব বাস্তবায়ন করা হয়নি। জানা যায়, রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ল্যাবরেটরিতেই শুধু হাম শনাক্তের পরীক্ষা করা হচ্ছে। তাও সেখানে কিটের স্বল্পতা রয়েছে। দিনে তিন-চার শ নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা থাকলেও কিটস্বল্পতার কারণে বর্তমানে গড়ে পরীক্ষা হয় মাত্র ১২০টির মতো। অন্যদিকে পর্যাপ্ত কিট থাকলে সারা দেশে আরো বেশ কিছু হাসপাতালে এই পরীক্ষার ব্যবস্থা করা যেত এবং রোগ শনাক্ত করার প্রক্রিয়া দ্রুততর হতো। আমরা আশা করি, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী সরকার হাম নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়