৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ১৮ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

সংস্কৃতির ওপর ন্যক্কারজনক আঘাত

আদিম অবস্থা থেকে মানুষ যখন থেকে সভ্য হতে শুরু করে, তখন থেকেই সংস্কৃতি সভ্যতার অনুগামী হয়। গান, কবিতা, নাটক, চিত্রকলা, স্থাপত্য, ভাস্কর্য ইত্যাদি ক্রমেই বিকশিত হতে থাকে। আর এসবের ভেতর দিয়ে মানবসভ্যতা পরিশীলিত হয়। ব্যক্তি ও রাষ্ট্রীয় জীবনে নীতি, নৈতিকতা, মানবতা, নানা ধরনের মতবাদ ইত্যাদি মানবিক ও সামাজিক গুণাবলি বিকাশ লাভ করে। যে দেশে যত বেশি সমৃদ্ধ সংস্কৃতি রয়েছে, সেই দেশকে তত বেশি সভ্য মনে করা হয়। হাজার হাজার বছরের পথ পরিক্রমায় বাংলাদেশেও অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল তৈরি হয়েছিল।আক্ষেপের বিষয়, সেই ঐতিহ্য, সেই গতিধারা মারাত্মকভাবে হোঁচট খেয়েছে শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে।প্রকাশিত দুটি প্রতিবেদন মানবিক বোধসম্পন্ন সব মানুষকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে এবং মর্মাহত করেছে। একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম হলো, ‘দুই হাজার শিল্পী নিগৃহীত’ এবং অপর প্রতিবেদনের শিরোনাম হলো, ‘মবের মুল্লুকে শিল্পীসমাজ’। ওই দেড় বছরে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনের দুই হাজারের বেশি মানুষ মব সহিংসতা, হামলা, মামলা, হুমকি ও হয়রানির শিকার হয়েছেন।জবরদস্তি চাকরিচ্যুতির ঘটনাও ঘটেছে। আক্রান্তদের মধ্যে রয়েছেন কবি-সাহিত্যিক-লেখক, নাট্যকর্মী, চলচ্চিত্রকর্মী, অভিনেতা-অভিনেত্রী, আবৃত্তিশিল্পী, চারুশিল্পী, নৃত্যশিল্পী বা সংস্কৃতি অঙ্গনের প্রায় সব শাখার মানুষ। দেশের নানা প্রান্তে যাত্রা, বাউলগান, সুফি, পালাগান, গ্রাম থিয়েটারসহ লোকজ সংস্কৃতির প্রতিটি অনুষঙ্গই আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছেন এসবের সঙ্গে যুক্ত শিল্পী, কলাকুশলী ও সংগঠকরা। তাঁদের অনেকেই নিরাপত্তাহীনতায় কাজ বন্ধ রেখেছেন, কেউ কেউ এলাকা ছেড়েছেন, কেউ দেশ ছেড়েছেন। আবার কেউ কেউ সংস্কৃতির নেশা বা পেশা পরিবর্তন করতেও বাধ্য হয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাউল, ফকির ও সুফিদের ওপর হামলা এবং তাঁদের অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়ার ঘটনা রাজধানীসহ দেশের বেশির ভাগ জেলায়ই পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ বাউল সমিতি ও বাংলাদেশ সুফি জাগরণ পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে দুই হাজারের কাছাকাছি পালাকার, বয়াতি, বাউলশিল্পী ও সংগঠক হামলার শিকার হয়েছেন। অনুষ্ঠান করতে গিয়ে তাঁরা বাধার মুখে পড়েছেন। অনেক বাউলশিল্পী ও সংগঠকের নামে হত্যা বা হত্যাচেষ্টার মামলা দেওয়া হয়েছে এবং সেসব মামলায় অনেকেই নিয়মিত হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
বিজ্ঞজনদের মতে, বাংলার সংস্কৃতি এতটাই ঋদ্ধ ছিল যে সমসাময়িক ভারতবর্ষে তুলনা বিরল। এই দেশটাকে একসময় ‘আউল-বাউলের দেশ’ বলা হতো। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে নানা আন্দোলনে বাউলদের অংশ নেওয়ার সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। জারি, সারি, ভাওয়াইয়া, পল্লীগীতি এ দেশের মানুষের মুখে মুখে। মলুয়া-মহুয়ার এ দেশে কবিগান, পালাগান, যাত্রা, গম্ভীরাসহ আরো বহু জনপ্রিয় বিনোদনের ঐতিহ্য ছিল। কবিয়াল রমেশ শীল, জালালউদ্দিন, বাউলসাধক শাহ আব্দুল করিমের মতো শিল্পীদের নিয়ে আমাদের গর্বের অন্ত নেই। ফকির লালন শাহর নাম সারা দুনিয়ায় পরিচিত। শিল্পী-সাহিত্যিক-সংস্কৃতিকর্মীদের সঙ্গে সেই দেড় বছরে যেসব ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে, তা দেখে এখন অনেকেই প্রশ্ন করছেন, অন্তর্বর্তী সরকার কি এ দেশের সব ঐতিহ্য ধ্বংস করতে চেয়েছিল? রিসেট বাটন টিপে সবকিছু মুছে দিতে চেয়েছিল?
আমরা চাই, বাংলার বাউলসহ সংস্কৃতিকর্মীদের ওপর অত্যাচার-নিপীড়ন কঠোর হাতে দমন করা হোক। এসব ঘটনায় যুক্ত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হোক। পাশাপাশি সংস্কৃতিকর্মীদের ওপর থাকা মামলার ব্যাপারে দ্রুত প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়