প্রতিদিনের ডেস্ক
বিধানসভার পরিষদীয় দল, লোকসভার সংসদীয় দল আগেই হাতছাড়া হয়েছে মমতার। হাতছাড়া হওয়ার মুখে নিজের হাতে প্রতিষ্ঠা করার দলের নাম, দলীয় প্রতীক, এমনকি দলের হাজার কোটি রুপি তহবিল। এমন অবস্থায় স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিদিনই এক এক করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ছাড়ছেন দলটির সিনিয়র ও জুনিয়র নেতৃত্ব। প্রতিদিনই ভাইপো অভিষেককে নিয়ে আরো কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন মমতা। শুক্রবার (১৯ জুন) মমতার নড়ে যাওয়ার ভিতে আরো ধাক্কা দিয়ে তার হাত ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সাবেক মন্ত্রী ও নেতা জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক। সদ্য শেষ হওয়া ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দলের ভরাডুবির পর শনিবার দলের সাংগঠনিক পদে রদবদল করা হয়েছিল। তৃণমূলের ন্যাশনাল ওয়ার্কিং কমিটিতে (জাতীয় কর্ম সমিতি) জায়গা দেওয়া হয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতা হয়েছিল জ্যোতিপ্রিয় মল্লিককে। কিন্তু এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই সেই পদ থেকে ইস্তফা দিলেন তিনি। তৃণমূল কংগ্রেসের সমস্ত দলীয় পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন সাবেক এই মন্ত্রী। শুক্রবার তিনি তার এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দেন দলনেত্রী মমতা ব্যানার্জিকে। নিজের শারীরিক অসুস্থতার বিষয়টি উল্লেখ করে মমতা ঘনিষ্ঠ এই তৃণমূল নেতা মুখ্যমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে হাতে লেখা চিঠিতে বলেছেন, “দীর্ঘদিন যাবৎ আমি শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছি। আমার ৩৫০-এর উপর সুগার, কিডনিও খারাপ হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে চিকিৎসকদের পরামর্শে আমার সম্পূর্ণ বিশ্রামের প্রয়োজন এবং কোনোপ্রকার মানসিক ও শারীরিক চাপ নেওয়া সম্ভব নয়। এমতাবস্থায়, দলের জাতীয় কর্ম সমিতির সদস্য পদের দায়িত্ব পালনে অব্যাহতি চেয়ে নিলাম।”
জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক ১৯৯৮ সালে দলের প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই সাথে ছিলেন। ২০১১ সাল থেকে পরপর তিনটি মেয়াদে হাবড়া আসন থেকে বিধায়ক হন। তারও আগে গাইঘাটা আসনের বিধায়ক ছিলেন তিনি। ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের খাদ্য ও খাদ্য সরবরাহ দপ্তরের মন্ত্রী ছিলেন। এরপর বন (ফরেস্ট) মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় দলের সংগঠন বিস্তারে গত ২ দশক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল জ্যোতিপ্রিয় এর উপরে। যদিও রেশন দুর্নীতি মামলায় ২০২৩ সালে তাকে গ্রেপ্তার করে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। এরপর কারাগারে যেতে হয় তাকে। পরে জামিনে মুক্তি পান। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পরেও তার পাশেই ছিলেন দলনেত্রী মমতা ব্যানার্জি। জ্যোতিপ্রিয় মল্লিককে ফাঁসানো হয়েছিল বলেও দাবি করেছিলেন মমতা। এমনকি সদ্য শেষ হওয়া ২০২৬ সালের বিধানসভার নির্বাচনেও তার উপরে ভরসা রেখে তাকেই হাবড়া আসনে চতুর্থ বারের জন্য প্রার্থী করেছিল দল। যদিও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা এমন একজন নেতাকে নির্বাচনে প্রার্থী করায় সমালোচনার ঝড় ওঠে। তাকে প্রার্থী করার পর দলের মধ্যেও অসন্তোষ দেখা যায়। দুর্নীতির অভিযুক্ত সেই জ্যোতিপ্রিয়কে যে হাবড়ার মানুষ গ্রহণ করেনি তা নির্বাচনের ফলাফলই পরিষ্কার। এই নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী দেবদাস মন্ডল এর কাছে পরাজিত হতে হয় তাকে। এমনকি এই নির্বাচনে তার দল তৃণমূল কংগ্রেস ও পর্যদুস্ত হয় গেরুয়ার শিবিরের কাছে। রাজ্যের ২৯৪ আসনের মধ্যে তৃণমূল জয় পায় ৮০ আসনে। নির্বাচনে ভরাডুবির পরই দলে ভাঙন শুরু হয়। দলের অন্দরে তৈরি হয় কোন্দল। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অভিযোগ আঙ্গুল তুলে ইতিমধ্যেই কেউ দলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন, কেউ নিজেদের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। রাজ্য বিধানসভায় এবং সংসদেও তৃণমূল ভেঙে তৈরি হয়েছে আরেকটা তৃণমূল। গত ১৫ বছরের শাসন ক্ষমতায় থাকা তৃণমূলের একাধিক নেতা নেত্রীর বিরুদ্ধে উঠেছে দুর্নীতি, তোলাবাজি, হুমকি প্রদর্শন, বেআইনি নির্মাণ, পায়ে বহির্ভূত সম্পত্তি গড়ে তোলা সহ একাধিক অভিযোগ। দিন যত যাচ্ছে, সেই সমস্ত তৃণমূল নেতা-নেত্রীদের বিরুদ্ধে জায়গায় জায়গায় জনরোষ ছড়িয়ে পড়ছে।

