পশ্চিম এশিয়ার ক্ষমতার মানচিত্র কি পাল্টে যাবে?

চিররঞ্জন সরকার
পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাতের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি হয়তো যুদ্ধ নয়, বরং যুদ্ধের রাজনৈতিক ফলাফল। বহু বছর ধরে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামো দাঁড়িয়ে ছিল একটি মৌলিক সমীকরণের ওপর—আমেরিকা নিরাপত্তা দেবে, ইজরায়েল হবে তার আঞ্চলিক প্রহরী, আর আরব মিত্ররা সেই ছাতার নিচে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করবে। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সেই সমীকরণকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।এক সময় প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ পশ্চিম এশিয়ার চিরাচরিত ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেবে। তাঁর বক্তব্য ছিল, এই সংঘাতের মধ্য দিয়ে ইজরায়েল শুধু নিজের নিরাপত্তাই নিশ্চিত করবে না, বরং গোটা অঞ্চলে নিজের প্রভাবও বহুগুণে বাড়াবে। কিন্তু বাস্তবতা আজ উল্টো প্রশ্ন তুলছে, আসলেই কি মানচিত্র বদলাচ্ছে? আর যদি বদলায়ও, সেটি কি ইজরায়েলের পক্ষে, নাকি তার বিপরীতে?
নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা সম্ভবত যুদ্ধ নয়, শান্তি। কারণ যুদ্ধের পরিবেশে তিনি নিজেকে জাতির রক্ষাকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন; কিন্তু যদি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কোনও সমঝোতা তৈরি হয়, তাহলে তাঁর বহু বছরের রাজনৈতিক বয়ান ধসে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে। ইরানকে ‘অস্তিত্বগত হুমকি’ হিসেবে তুলে ধরে যে নিরাপত্তা-রাজনীতি তিনি নির্মাণ করেছেন, মার্কিন-ইরান সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করলে সেই বয়ানের গ্রহণযোগ্যতাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে।এই কারণেই সম্ভাব্য মার্কিন-ইরান সমঝোতার খবরে তেল আবিবের অস্বস্তি বাড়ছে। ট্রাম্পের মতো একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে ইজরায়েলের সবচেয়ে বড় বন্ধু হিসেবে তুলে ধরেছেন, তিনিই যদি শেষ পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে আপসের পথে হাঁটেন, তাহলে সেটি নেতানিয়াহুর জন্য কেবল কূটনৈতিক ধাক্কা নয়; রাজনৈতিক অপমানও বটে।
ঘটনার তাৎপর্য আরও গভীর। কারণ এটি কেবল দুই নেতার ব্যক্তিগত মতবিরোধ নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের কৌশলগত অগ্রাধিকারের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ফারাকের বহিঃপ্রকাশ। ইজরায়েল চাইছে ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি চাপ বজায় রাখতে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, বিশেষ করে ট্রাম্প, মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি দীর্ঘ যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বোঝা বহন করতে আগ্রহী নন। ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের মধ্যে ওয়াশিংটনের কাছে স্থিতিশীলতা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠে আসে, এই সংঘাতে আসলে কে লাভবান হলো?
প্রথম নজরে ইজরায়েলকে শক্তিশালী মনে হতে পারে। তাদের সামরিক সক্ষমতা এখনও অঞ্চলের সবচেয়ে আধুনিক। কিন্তু কৌশলগত বিচারে চিত্রটি ভিন্ন। কারণ যুদ্ধের মূল লক্ষ্য যদি হয়ে থাকে ইরানকে দুর্বল করা, তাহলে সেই লক্ষ্য পূরণ হয়েছে বলে মনে হয় না। ইরানি রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকে আছে, তাদের আঞ্চলিক মিত্র নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তেহরান এখনও আঞ্চলিক শক্তির সমীকরণে কেন্দ্রীয় খেলোয়াড় হিসেবে রয়ে গেছে।বরং অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার সম্ভাবনা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে পুনঃপ্রবেশের সুযোগ ইরানকে নতুন রাজনৈতিক অক্সিজেন দিতে পারে। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা, জ্বালানি রপ্তানি বৃদ্ধি এবং বাজেয়াপ্ত সম্পদ ফিরে পাওয়ার সুযোগ তেহরানের হাতে নতুন কৌশলগত সম্পদ তুলে দিতে পারে। আর সেই অর্থ শুধু অভ্যন্তরীণ উন্নয়নে নয়, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারেও ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পশ্চিম এশিয়ার রাজনীতিকে বুঝতে হলে আরেকটি বিষয় মনে রাখতে হবে। ইরানের শক্তি কেবল তার সেনাবাহিনীতে সীমাবদ্ধ নয়। লেবাননে হেজবোল্লাহ, ইয়েমেনে হুথি, ইরাক ও সিরিয়ায় বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী, এসব মিলিয়ে তেহরান এমন একটি প্রভাব বলয় গড়ে তুলেছে, যা প্রচলিত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি নমনীয়। ফলে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালালেই তার প্রভাব কমে যাবে, এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
এদিকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটছে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকায়। গত কয়েক দশক ধরে পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা স্থাপত্য মূলত মার্কিন শক্তির ওপর নির্ভরশীল ছিল। উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো বিশ্বাস করত, সংকট দেখা দিলে ওয়াশিংটন তাদের রক্ষা করবে। কিন্তু আফগানিস্তান থেকে মার্কিন প্রত্যাহার, ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং সাম্প্রতিক কূটনৈতিক অবস্থান অনেক দেশকেই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।ফলে সৌদি আরব, কাতার, ওমান কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাত, কেউই এখন আর একমাত্র মার্কিন নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভর করে থাকতে চাইছে না। তারা একই সঙ্গে বেইজিং, মস্কো, তেহরান এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে। অর্থাৎ অঞ্চলটি ধীরে ধীরে একমেরু কাঠামো থেকে বহুমেরু কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে। এই পরিবর্তনের পেছনে চীনের ভূমিকাও উপেক্ষা করা যায় না। কয়েক বছর আগেও পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা ও কূটনীতি প্রায় পুরোপুরি আমেরিকাকেন্দ্রিক ছিল। এখন চীন অর্থনৈতিক বিনিয়োগ, জ্বালানি বাণিজ্য এবং কূটনৈতিক মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিজের উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। রাশিয়াও সিরিয়া ও ইরানের মাধ্যমে এই অঞ্চলে প্রভাব ধরে রাখতে চাইছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র আর একক নিয়ন্ত্রক শক্তি নয়; বরং অনেক শক্তির মধ্যে অন্যতম একটি শক্তি।
পাকিস্তান ও তুরস্কের ভূমিকাও ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। পারমাণবিক অস্ত্রধারী পাকিস্তান শুধু দক্ষিণ এশিয়ার দেশ নয়; উপসাগরীয় নিরাপত্তা রাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তুরস্ক আবার নিজেকে মুসলিম বিশ্বের বিকল্প নেতৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। ফলে পশ্চিম এশিয়ার সমীকরণ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল। তবে এই পরিবর্তনকে নতুন স্থিতিশীলতার পূর্বাভাস হিসেবে দেখা ভুল হবে। কারণ বহুমেরুতা সবসময় শান্তি আনে না; অনেক সময় তা প্রতিযোগিতা ও অনিশ্চয়তা বাড়ায়। আজকের পশ্চিম এশিয়ায় রাষ্ট্রের পাশাপাশি প্রক্সি গোষ্ঠী, সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং কৌশলগত চোকপয়েন্টগুলোও ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী এবং বাব আল-মানদাব প্রণালীর গুরুত্ব ক্রমাগত বাড়ছে। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের জ্বালানি পরিবহণ এই পথগুলো দিয়ে হয়। ফলে এখানে সামান্য উত্তেজনাও বৈশ্বিক অর্থনীতি কাঁপিয়ে দিতে পারে। হুথিদের হামলা কিংবা ইরানের সামুদ্রিক চাপ সৃষ্টির সক্ষমতা তাই কেবল আঞ্চলিক সমস্যা নয়; এটি আন্তর্জাতিক অর্থনীতিরও প্রশ্ন।এখানেই ইজরায়েলের সামনে সবচেয়ে বড় কৌশলগত সংকট। যদি তারা পাল্টা আঘাত না করে, তাহলে দুর্বল দেখানোর ঝুঁকি থাকে। আবার যদি ক্রমাগত আঘাত করে, তাহলে এমন এক সংঘাতকে উসকে দেওয়ার আশঙ্কা থাকে যা শেষ পর্যন্ত তাদের নিজের নিরাপত্তাকেই আরও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় এটিই ‘এস্ক্যালেশন ডিলেমা’, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ নিরাপত্তা বাড়ানোর বদলে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে দেয়।সুতরাং পশ্চিম এশিয়ার মানচিত্র সত্যিই বদলাচ্ছে। কিন্তু সেই পরিবর্তন কোনও একক শক্তির বিজয়ের গল্প নয়। এটি বরং আমেরিকান একচ্ছত্র আধিপত্যের ধীরে ধীরে ক্ষয়, ইরানের কৌশলগত পুনরুত্থান, ইজরায়েলের নিরাপত্তা-দ্বিধা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নতুন সমীকরণ খোঁজার এক জটিল প্রক্রিয়া।নেতানিয়াহু যে নতুন মধ্যপ্রাচ্যের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, বাস্তবতা সম্ভবত তার চেয়ে ভিন্ন। পশ্চিম এশিয়ার মানচিত্র হয়তো সত্যিই বদলাচ্ছে, কিন্তু সেটি ইজরায়েলের কল্পিত ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ নয়। বরং এমন এক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে যেখানে আমেরিকার একক আধিপত্য দুর্বল, ইজরায়েলের কৌশলগত স্বাধীনতা সীমিত, ইরানের প্রভাব বাড়ছে, আর আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষায় নতুন নতুন জোট ও সমীকরণ খুঁজছে। এই পরিবর্তন স্থিতিশীলতার নয়; বরং এক দীর্ঘ ও অনিশ্চিত ক্ষমতা-পুনর্বিন্যাসের সূচনা।
লেখক : জ্যেষ্ঠ কলামিস্ট।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়