ভঙ্গুর ও বিপর্যস্ত সামষ্টিক অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের এক বিশাল চ্যালেঞ্জ নিয়ে বর্তমান সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে। রাজধানীর একটি হোটেলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘বাজেট সংলাপে’ অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অকপটেই জানিয়েছেন দেশের অর্থনৈতিক সংকটের সেই প্রকৃত ও রূঢ় বাস্তবতার কথা। তিনি স্পষ্টতই বলেছেন, পতিত সরকারের রেখে যাওয়া বিপুল অঙ্কের দেনা ও আর্থিক খাতের কাঠামোগত ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে অর্থনীতিকে পুরোপুরি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধির পথে ফেরানো রাতারাতি সম্ভব নয়। বর্তমান সরকারের এই খোলামেলা স্বীকারোক্তি একটি বিষয়কে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করে-অপ্রিয় হলেও সত্য ও বাস্তবতা প্রকাশে এই সরকার কোনো লুকোচুরি করছে না, বরং অলীক কোনো স্বপ্নের গোলকধাঁধায় জনগণকে না রেখে বাস্তবতাকে জয় করে একটি টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণে তারা বদ্ধপরিকর। সংলাপে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, শুধু জ্বালানি খাতেই পতিত সরকার প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার দেনা রেখে গেছে। এই বিশাল দায়ভার কাঁধে নিয়ে মাত্র দেড় মাসের প্রস্তুতিতে সরকারকে বাজেট ঘোষণা করতে হয়েছে, যা যে কোনো মানদণ্ডেই এক নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জ। আমরা মনে করি, জনগণকে বাস্তবতা স্পষ্টভাবে জানানোই হলো সুশাসনের প্রথম শর্ত। অলীক ও সস্তা আশ্বাসের চেয়ে এই সততা অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য। তবে শুধু সংকটের খতিয়ান তুলে ধরাই শেষ কথা নয়, বরং এই সংকট মোচনে সরকারের গৃহীত সংস্কারমুখী ও সাহসী পদক্ষেপগুলোও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। আশার কথা, প্রকল্প বাস্তবায়নে অতীতের স্থবিরতা ও দীর্ঘসূত্রতা দূর করতে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ থেকেই ‘বিশেষ ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড’ চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এছাড়া শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক-কর হ্রাস এবং তৈরি পোশাকের বাইরে অন্য যে কোনো খাতের রপ্তানিকারকদের জন্য বন্ড সুবিধা বা ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত আমদানির সুযোগ দেওয়া দেশের উৎপাদন খাতকে পুনরুজ্জীবিত করার এক অনন্য উদ্যোগ। একই সঙ্গে এলসি খোলার বাধ্যবাধকতা শিথিল করার সিদ্ধান্তও ব্যবসায়িক গতিশীলতা বৃদ্ধি করবে। ভুলে গেলে চলবে না, মূল্যস্ফীতির জাঁতাকলে পড়ে নিম্ন-আয়ের মানুষ আজ খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা কমিয়ে দিয়ে কঠিন জীবনযাপন করছে। সংলাপে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং শিক্ষার গুণগত মানের যে তিনটি বড় সংকটের কথা উঠে এসেছে, তা দূর করতে বাজেটের বরাদ্দগুলোর যথাযথ ও স্বচ্ছ বাস্তবায়ন জরুরি। জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্পগুলো যাতে বন্ধ হয়ে না যায় এবং চড়া সুদের হারের চাপে বেসরকারি খাত যাতে পঙ্গু না হয়, সেজন্য স্পষ্ট নীতিমালার প্রয়োজন। আমরা বিশ্বাস করি, সরকার যেহেতু গোড়াতেই গলদগুলো স্বীকার করে নিয়েছে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের মতো মৌলিক অবকাঠামোয় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করছে, সেহেতু এই রূপান্তর অসম্ভব নয়। সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে এই কঠিন বাস্তবতাকে জয় করে সরকার দেশের অর্থনীতিকে একটি মজবুত ও স্বনির্ভর ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে-এটাই প্রত্যাশা।
