প্রতিদিনের ডেস্ক:
এবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলীয় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের দখল নিয়েছে বিদ্রোহী ‘আসল’ তৃণমূল। ২ জুলাই দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করেছে তৃণমূলের বিদ্রোহী অংশ। এর পরেই শহরে ফিরে মেট্রোপলিটনের তৃণমূল ভবনের কার্যত ‘দখল’ নিয়েছে তারা। শুক্রবার সন্ধ্যায় বিদ্রোহী আসল তৃণমূলের নেতা তথা বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ছাড়াও একাধিক বিধায়ক এসে পৌঁছলেন ওই অফিসে। ছিলেন সন্দীপন সাহা, ফিরহাদ হাকিম, জাভেদ খান, আখরুজ্জামান, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় সহ একাধিক বিধায়ক।সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ অফিসে পৌঁছানোর পর একপ্রস্থ বৈঠক সেরে ভবনের বাইরের মূল গেটে তালা ঝুলিয়ে বেরিয়ে যান ঋতব্রতরা। আর এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই সেখানে হাজির হন কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের অন্যতম মুখ তথা কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের বিধায়ক কুণাল ঘোষ। এরপর দু’পক্ষই এ নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলেছে।ইতিমধ্যেই তৃণমূল ভবনের বিশালতা আগের থেকে অনেকটাই কমে গিয়েছে। কারণ, এই তৃণমূল ভবনের যিনি মালিক, তিনি এই ভবনের অনেকটা অংশের দখল নিয়ে নিয়েছেন। তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়ের একমাসের মধ্যে এই ভবন ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ জারি করেছিলেন ভবনটির মালিক। এরপর জোরপূর্বক বেশ কয়েকটি ফ্লোর খালিও করা হয়েছিল। এরপর সেই ভবনের বাকি অংশের দখল নিল বিদ্রোহী তৃণমূল। বিদ্রোহী তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা ও বিধায়ক আখরুজ্জামান সংবাদমাধ্যমকে জানান, এই বিশেষ পার্টি অফিসটির সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘদিনের আবেগ এবং ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে। তাই এর রাশ নিজেদের হাতে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি ছিল।আখরুজ্জামান বললেন, “আমরা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস। এই অফিসটা আমাদের। আমাদের কাছে খবর আছে এতদিন ভরসা করে আমরা যাঁদের নেতৃত্বে চলছিলাম, অফিসটা তারা মেনটেন করতে পারছে না। বাড়ির মালিক এই অফিস দখল করে নিয়েছে। আমরা মালিককে বলেছি, এই অফিসটা আমাদের আবেগ, এটা তৃণমূলের অফিস। যে কোনো স্বার্থের বিনিময়ে এই অফিস আমাদের চলবে, আমরা বসব।”এদিন মেট্রোপোলিটনে তৃণমূল অফিসের বাইরে নতুন করে দলের দু’টি পোস্টার ঝোলায় ঋতব্রত-শিবির। সেখানে গেটে ঢোকার মুখে বাঁদিকের পোস্টারে মমতা ব্যানার্জি ছবি দেখা যায়, উধাও অভিষেক ব্যানার্জির ছবি। তবে, ডানদিকের পোস্টারে চেয়ারপার্সন হিসেবে নাম রয়েছে অরূপ রায়ের। কেন মমতার ছবি? জবাবে ঋতব্রত বলেছেন, “মমতা ব্যানার্জি আমাদের পরামর্শদাতা। আর কিছু বলতে চাই না।”ঋতব্রতরা যাওয়ার আগে পার্টি অফিসে আবারো তালা ঝুলিয়ে চলে যান। এরপর উত্তেজনা যেন আর না বাড়তে পারে তাই পার্টি অফিস ঘিরে ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয় পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী।যে কার্যালয়টি ঋতব্রত শিবির দখল করেছে, সেটি মূলত কুণাল ঘোষের বিধানসভা এলাকার অন্তর্গত। খবর পেয়েই কালক্ষেপ না করে সেখানে পৌঁছে যান কুণাল। তবে এই উত্তেজনার আবহেও কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত না নিয়ে কর্মীদের শান্ত থাকার বার্তা দেন তিনি। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ঋতব্রত শিবিরের এই পদক্ষেপকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে কটাক্ষ করেন কুণাল ঘোষ।কুণাল বলেন, “আমরা একবার থানা, একবার কোর্ট আর একবার এলাকায় দৌড়ে বেড়াচ্ছি। আর এই সমস্ত লোকেরা একবার বিজেপির নেতার বাড়ি, তো একবার হোটেলে গিয়ে বিজেপি নেতার কাছে এগুলো করে বেড়াচ্ছে।”মানুষের ওপরই বিচার ছেড়ে দিয়ে কুণাল জানান, তারা গোটা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সঙ্গেই এর মোকাবিলা করা হবে।পরে প্রগতি ময়দান থানায় অভিযোগ জানান কুণাল ঘোষ। মেট্রোপোলিটনের দলীয় দপ্তরে আচমকা কেউ এসে যাতে ঢুকতে না পারে তাই কড়া নিরাপত্তার আবেদন জানান হয়েছে। পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বেলেঘাটার তৃণমূল বিধায়ক। কুণাল ঘোষের কথায়, ঋতব্রতদের কাজকে ফলোআপ করার ভূমিকা পালন করেছে পুলিশ।এর আগে বৃহস্পতিবার দুপুরে দিল্লির নির্বাচন সদনে গিয়ে নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চের সঙ্গে দেখা করে ঋতব্রত শিবির সাফ দাবি করে এসেছে, ঘাসফুল শিবিরের আসল নিয়ন্ত্রক আসলে তারাই। দল বা প্রতীক নিয়ে কোনো ধোঁয়াশাই নেই।নির্বাচন কমিশনের দপ্তরের ঋতব্রতের নেতৃত্বে ১০ জনের প্রতিনিধি দল হাজির হয়েছিল, যার মধ্যে ছিলেন ৯ জন বিধায়ক ও একজন প্রাক্তন মন্ত্রী। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ঋতব্রত দাবি করেছিলেন, দলের দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়ক, কাউন্সিলর এবং জেলা পরিষদের সদস্যরা তাদের পাশেই আছেন। ফলে প্রতীক বা দলের নাম হাতছাড়া হওয়ার কোনো আশঙ্কাই নেই।এদিকে মেট্রোপলিটানের ভবন দখল নিয়ে ‘কালীঘাট তৃণমূল’ বনাম ‘ঋতব্রত তৃণমূলে’র জোর দড়ি টানাটানির মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন তার দীর্ঘদিনের সঙ্গী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য । দলীয় কার্যালয়ে দখলের সঙ্গে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য যুক্ত বলেই সন্দেহপ্রকাশ করেন খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর সেই ‘অভিমানে’ তৃণমূলের সমস্ত পদ ছেড়েছেন চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। রাজ্য সভাপতি-সহ একাধিক পদে ছিলেন তিনি। তৃণমূলের অ্যাকাউন্টের সিগনেটরি দায়িত্ব থেকেও অব্যাহতি নিয়েছেন তিনি। চন্দ্রিমা বলেন, “শুক্রবার একটা ঘটনা হয়েছে যা সকলের জানা। বেশ কয়েকজন বিধায়ক গিয়েছিলেন। আমি যতক্ষণ ছিলাম ওই বিধায়করা আমার সঙ্গে কথা বলেননি। আমি বাড়ি চলে আসার পর মমতাদি ফোন করতে বলেন। ফোন করলে বলেন, তুমি ওদের হাতে ভবন তুলে দিলে? আমার এত দুঃখ হয়েছে। আমি বললাম, দিদি আপনি আমাকে এই কথা বলতে পারলেন? সেই কারণে আমি মনে করলাম আমার আনুগত্যে প্রশ্নচিহ্নে থেকে যাচ্ছে। আমি মনে করি এই পরিস্থিতিতে আর আমার কাজ করা উচিত নয়। আমি অনেক সময় অনেকের প্রতি কঠিন হয়েছি। কিন্তু আনুগত্যে কোনো খামতি নেই। বেদনাহত মন নিয়ে আমি ছেড়ে দিলাম।”
