ককটেলের শব্দ, নীরবতার প্রতিধ্বনি

চিররঞ্জন সরকার
সাভারে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জুলাই পদযাত্রা-পরবর্তী সমাবেশে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এর আগে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়েও একই ধরনের হামলার অভিযোগ উঠেছিল। সর্বশেষ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠিয়েছে। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের দাবি, গভীর রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় তাঁদের বাড়ি থেকে তুলে এনে মামলায় জড়ানো হয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, অভিযুক্তরা রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নন; তাঁরা ব্যবসায়ী। স্থানীয় বিরোধ ও তৃতীয় পক্ষের প্ররোচনায় তাঁদের বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে।
ঘটনাটি তদন্তের বিষয়। আদালতই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবেন কে দোষী, কে নির্দোষ। কিন্তু ঘটনাটির চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে ঘটনাকে ঘিরে সমাজের প্রতিক্রিয়া—অথবা আরও নির্দিষ্ট করে বললে, প্রতিক্রিয়ার অনুপস্থিতি। একসময় ককটেল বিস্ফোরণ মানেই ছিল আতঙ্ক, নিন্দা, বিবৃতি, টকশো, মানববন্ধন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড়। এখন যেন বিস্ফোরণের শব্দের চেয়েও জোরে বাজে নীরবতা।বাংলাদেশে ককটেল এখন আর কেবল একটি বিস্ফোরক নয়; এটি যেন এক ধরনের রাজনৈতিক ভাষা। আগে এর শব্দে মানুষ জানালা বন্ধ করত, এখন আঙুলের এক ঝটকায় টাইমলাইন স্ক্রল করে। বিস্ফোরণের তীব্রতা নয়, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে—কার সমাবেশে ফেটেছে, কে লাভবান হবে, কে প্রথম পোস্ট দিল, আর কে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পেল। ঘটনাটি যেন ঘটার আগেই তার ব্যাখ্যা তৈরি হয়ে যায়। বিস্ফোরণের ধোঁয়া মিলিয়ে যাওয়ার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আদালত রায় লিখে ফেলে।
একসময় একটি ককটেল মানেই ছিল ব্রেকিং নিউজ। টেলিভিশনের নিচে লাল দাগ ছুটত, বিশ্লেষকরা স্টুডিওতে বসে জাতীয় নিরাপত্তা থেকে বিশ্ব রাজনীতি পর্যন্ত সবকিছু ব্যাখ্যা করে ফেলতেন। এখন ককটেলও বুঝে গেছে, বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। রিল ভিডিও, ট্রেন্ডিং হ্যাশট্যাগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ছবি আর ভাইরাল নাচের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তার আর চলে না।
তাই আজকাল বিস্ফোরণেরও একটি পরিচয়পত্র লাগে। কার সমাবেশে ফেটেছে? কার সমর্থকের গায়ে ধুলো লেগেছে? কোন পক্ষ আগে পোস্ট দিয়েছে? কোন পক্ষ পরে লাইভে এসেছে? তারপর ঠিক হয়, এটি জাতীয় সংকট হবে, নাকি সন্ধ্যার মধ্যে সবাই ভুলে যাবে।আমাদের সমাজে ঘটনার গুরুত্ব এখন আর ঘটনার মধ্যে নেই; গুরুত্ব নির্ভর করে দর্শকের আগ্রহে। দর্শক যদি হাই তোলে, তবে বিপ্লবও ফ্লপ। দর্শক যদি হাততালি দেয়, তবে হাঁচিও ইতিহাস।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, আমরা এখন ঘটনার আগে তার ষড়যন্ত্র তত্ত্ব তৈরি করি। কোনো বিস্ফোরণ ঘটলে আগে প্রশ্ন ওঠে, “এটা সত্যি তো?” তারপর আসে, “নিজেরাই করেনি তো?” এরপর আসে, “টাইমিংটা একটু সন্দেহজনক না?” ঘটনাটি তদন্তের আগেই তদন্ত শেষ। আদালতের আগেই রায়। ইতিহাসের আগেই ফুটনোট।আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে প্রত্যেক নাগরিক অর্ধেক গোয়েন্দা, অর্ধেক বিচারক এবং পূর্ণকালীন মন্তব্যকারী।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের এমন এক অলৌকিক ক্ষমতা দিয়েছে, যেখানে প্রত্যেকের হাতে একটি করে অদৃশ্য হাতুড়ি। যে খবর পছন্দ নয়, তাকে পিটিয়ে ভুয়া বানিয়ে দেওয়া যায়। যে খবর পছন্দ, তাকে প্রমাণ ছাড়াই সত্য ঘোষণা করা যায়।
জনমতের আয়ুও এখন বর্ষার রংধনুর মতো। সকালে যে নায়ক, বিকেলে তিনি সন্দেহভাজন। গত সপ্তাহে যার জন্য মানুষ প্রোফাইল ছবি বদলেছিল, এই সপ্তাহে তার নামের বানানও মনে নেই। রাজনীতিতে স্মৃতিভ্রংশ এখন কোনো রোগ নয়; এটি একটি কৌশল।
বাংলাদেশে আন্দোলনেরও আজকাল মেয়াদ থাকে। মোবাইল ডেটা প্যাকের মতো। নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত উত্তেজনা, তারপর নবায়ন না করলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন।
কখনো যে স্লোগান পাহাড় কাঁপাত, আজ সেটি অ্যালগরিদমের ভিড়ে হারিয়ে যায়। যে মুখ একদিন পোস্টারের প্রতীক ছিল, পরে সেটিই মিমের উপকরণ হয়ে ওঠে। জনতার ভালোবাসা যেমন হঠাৎ আসে, তেমনি হঠাৎই বিদায় নেয়। রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ অনেক সময় প্রতিপক্ষ দল নয়; জনগণের বিরক্তি।
গণতন্ত্রে সমর্থন অর্জন কঠিন। কিন্তু সমর্থন ধরে রাখা তার চেয়েও কঠিন। কারণ মানুষ কেবল প্রতিশ্রুতি শোনে না, প্রতিশ্রুতির পরে আচরণও দেখে। ইতিহাস সাক্ষী, অনেক আন্দোলন ক্ষমতার দরজায় পৌঁছে নিজেদের ভাষাই ভুলে গেছে। আবার অনেক ক্ষমতাবানও ভেবেছে, মানুষের স্মৃতি খুব ছোট। পরে দেখা গেছে, স্মৃতি ছোট নয়; ধৈর্য ছোট।
আমাদের রাজনীতিতে আরেকটি চমৎকার বিষয় আছে। এখানে প্রত্যেকে জনগণের প্রতিনিধি, কিন্তু জনগণ কোথায়—তা কেউ জানে না। সবাই বলে, “জনগণ আমাদের সঙ্গে।” জনগণ বেচারা সম্ভবত তখন বাসে ঝুলছে, বাজারে নিত্যপণ্যের দাম মেলাচ্ছে, অথবা বিদ্যুতের বিলের হিসাব কষছে।
জনগণের নামে সবচেয়ে বেশি কথা বলা হয়, কিন্তু জনগণের সঙ্গে সবচেয়ে কম কথা বলা হয়।
একসময় রাজনীতি ছিল মাঠের শিল্প। এখন এটি ক্যামেরার শিল্প। মিছিলের চেয়ে ড্রোন শট গুরুত্বপূর্ণ। বক্তব্যের চেয়ে থাম্বনেইল। দর্শনের চেয়ে ক্যাপশন। একটি সফল রাজনৈতিক কর্মসূচির পরিমাপ এখন অংশগ্রহণকারীর সংখ্যায় নয়, বরং কত লাখ ভিউ হয়েছে—সেটিতে।
ফলে বাস্তবতা আর ভার্চুয়াল বাস্তবতার মধ্যে একটি অদ্ভুত প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। মাঠে হাজার মানুষ থাকলেও যদি অনলাইনে কেউ না দেখে, তবে অনুষ্ঠান ব্যর্থ। আবার মাঠ প্রায় ফাঁকা হলেও যদি ক্যামেরার কোণ ঠিক থাকে, তবে সেটিই ঐতিহাসিক সমাবেশ।এ যেন রাজনীতিরও সিনেমাটোগ্রাফি।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন সম্ভবত মানুষের প্রতিক্রিয়ায়। আগে মানুষ উত্তেজিত হতো। এখন ক্লান্ত হয়। আগে বিতর্ক করত। এখন স্ক্রল করে। আগে প্রশ্ন করত। এখন ইমোজি দেয়।
এই নীরবতা কি উদাসীনতার? নাকি অভিজ্ঞতার? সম্ভবত দুটোরই। তবে এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরও একটি জিনিস—ক্লান্তি। বারবার নতুন পতাকার নিচে পুরোনো রাজনীতি, নতুন মুখের ভেতর পুরোনো ভাষা, নতুন প্রতিশ্রুতির আড়ালে পুরোনো হিসাব দেখে মানুষ এখন আর সহজে বিস্মিত হয় না। তারা হাততালি দেওয়ার আগে হাত গুটিয়ে রাখে, বিশ্বাস করার আগে অপেক্ষা করে, আর আবেগে ভেসে যাওয়ার আগে নিজের বাজারের ব্যাগটা একবার দেখে নেয়।
এ দৃশ্য রাজনীতির জন্য নিশ্চয়ই সুখকর নয়। কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য একেবারে অস্বাস্থ্যকরও নয়। কারণ প্রশ্নহীন উচ্ছ্বাস যেমন বিপজ্জনক, তেমনি প্রশ্নহীন বিদ্বেষও। গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শত্রু মতভেদ নয়; অন্ধ আনুগত্য।
রাজনীতির সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা কখনো প্রতিপক্ষের সামনে হয় না, হয় নিজের সমর্থকদের সামনে। বিরোধীরা আপনার ভুল ধরবেই, এটাই তাদের কাজ। কিন্তু একদিন যদি নিজের লোকেরাই চুপ হয়ে যায়, সেটিই সবচেয়ে অশুভ সংকেত। কারণ প্রতিবাদ অনেক সময় শব্দ করে আসে, কিন্তু আস্থা ভাঙে নিঃশব্দে। যে মাইক্রোফোন একসময় করতালিতে কেঁপে উঠত, একসময় সেটিই শুধু নিজের প্রতিধ্বনি শুনতে পায়।ককটেলের বিস্ফোরণ কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হয়। কিন্তু জনতার নীরবতা অনেক দীর্ঘস্থায়ী। বিস্ফোরণ দেয়ালে দাগ ফেলে, নীরবতা ফেলে রাজনীতির ইতিহাসে। ককটেলের শব্দ তদন্তে ধরা পড়ে, কিন্তু আস্থা হারানোর শব্দ কোনো ফরেনসিক পরীক্ষায় ধরা পড়ে না।
তাই বাংলাদেশের রাজনীতির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ককটেল নয়, করতালি নয়, স্লোগানও নয়। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, মানুষ কি এখনও বিশ্বাস করতে চায়, নাকি তারা শুধু স্ক্রল করে পরের খবরের অপেক্ষায় আছে? কারণ গণতন্ত্রের সবচেয়ে ভয়ংকর মুহূর্ত সেটা নয়, যখন মানুষ রাগে চিৎকার করে; বরং সেই মুহূর্ত, যখন তারা আর কিছুই বলে না!
লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলামিস্ট।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়