টানা দশ ঘণ্টায় রেকর্ড ১৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত যশোরসহ নিম্নাঞ্চলে তীব্র জলাবদ্ধতা : ফসলের ক্ষেত-ঘরবাড়ি পানির নিচে , রান্না-খাওয়া বন্ধ

সৈকত হোসেন
টানা দশ ঘণ্টায় রেকর্ড ১৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতে যশোরের নিম্নাঞ্চলে তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) রাত থেকে শুরু হওয়া মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণে যশোর শহর, শহরতলীসহ গোটা জেলার নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেছে। ভেঙে পড়েছে শহরের অধিকাংশ এলাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা। পানি প্রবেশ করেছে নিচু এলাকার ঘরবাড়িতে। এক রাতের ভারী বর্ষণে সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি, হৈবতপুর ও কাশিমপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকার সবজিক্ষেত জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। অনেক জমি বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বাঁধাকপি ও ফুলকপির চারা উৎপাদনকারী চাষিরা। পাশাপাশি ধানের বীজতলাও পানির নিচে তলিয়ে গেছে। স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব এলাকায় পটল, পুঁইশাক, বরবটি, উচ্ছে, ঢেঁড়স, বেগুন, কচুরমুখী ও কচুর লতিসহ বিভিন্ন ধরনের সবজির চাষ হয়েছে। পহেলা আষাঢ়ের পর থেকে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত না হলেও বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুরু হওয়া ভারী বর্ষণে অধিকাংশ সবজিক্ষেত পানির নিচে চলে যায়। কৃষকদের আশঙ্কা, আরও দুই-এক দিন ভারী বৃষ্টি হলে উঁচু জমির পটল ও উচ্ছের ক্ষেতও জলাবদ্ধ হয়ে পড়বে। ইতোমধ্যে নিচু জমির অনেক সবজি ক্ষেত তলিয়ে গেছে। ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ ও কৃষকরা। যশোর বিমান বাহিনীর আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ২টা থেকে শুক্রবার (১০ জুলাই) দুপুর ১২টা পর্যন্ত ১০ ঘণ্টায় মোট ১৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। টানা এই ভারী বর্ষণের ফলেই তলিয়ে যায় শহরের নিচু এলাকাগুলো। সরেজমিনে দেখা গেছে, শহরের প্রধান প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার রাস্তা এখন পানির নিচে। অনেক সড়কেই হাঁটু পর্যন্ত পানি। এছাড়াও পুকুর, মাঠ-ঘাট ও পতিত জমি পানিতে ডুবে গেছে। আবার কোথাও কোথাও বৃষ্টির পানিতে মানুষকে মাছ ধরতেও দেখা গেছে। শহরের টিবি ক্লিনিক এলাকা, খড়কি এলাকার শাহ আবদুল করিম সড়ক, ধর্মতলা রোড, আপন মোড়, চারখাম্বার মোড় মোড়, মুজিব সড়কের রেলগেট এলাকা, নাজির শংকরপুর, খড়কি রূপকথা মোড়, বেজপাড়া চিরুনিকল মোড়, মিশনপাড়া, আরবপুর, বিমানবন্দর সড়ক, শংকরপুর চোপদারপাড়া ও স্টেডিয়ামপাড়ার সড়কসহ বিভিন্ন সড়কের অধিকাংশ সড়কেই পানি জমেছে। শহরের টিবি ক্লিনিক এলাকার রফিকুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘জলাবদ্ধতা যেন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। জনপ্রতিনিধিদের অনেকেই আশ্বাস দেন আগামীতে এ সমস্যা আর থাকবে না। কিন্তু তাদের দেওয়া কথা তারা রাখেন না।’ শহরের শংকরপুর এলাকার বাসিন্দা নাসরিন আক্তার বলেন, গোটা এলাকায় পানি জমে গেছে। অনেকের ঘরে পানি উঠে গেছে। ফলে রান্না খাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। কখন পানি নামবে, সেই আশায় বসে আছি। শহরের স্টেডিয়াম পাড়া এলাকার আব্দুল মজিদ বলেন, ‘সামান্য বৃষ্টি হলেই স্টেডিয়ামের মেইন গেটের সামনে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। তবে আজকে আপন মোড় থেকে শুরু করে পৌর হকার্স মার্কেট পর্যন্ত পানিতে একাকার হয়ে গেছে।’ শহরের খড়কি এলাকার বাসিন্দা আজগর আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ড্রেনগুলো অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। আর ড্রেনগুলোকে নাগরিকরা ডাস্টবিনে পরিণত করেছে। এগুলো নিয়মিত পরিষ্কারও করা হয়নি। ফলে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।’ স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ এবং সরেজমিনে দেখা গেছে, কেবল বৃষ্টি নয়, এই জলাবদ্ধতার পেছনে মূল কারণ শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার বেহাল দশা। শহরের বিভিন্ন হোটেল-রেস্টুরেন্ট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য সরাসরি ড্রেনে ফেলার কারণে ড্রেনগুলো ভরাট হয়ে গেছে। অনেক জায়গায় ড্রেনের নিচে নদীর মতো পলি জমে আছে। আবর্জনার স্তূপের কারণে বৃষ্টির পানি স্বাভাবিক গতিতে নামতে পারছে না। কোথাও অর্ধেক, আবার কোথাও সম্পূর্ণ ড্রেন ময়লা ও পানিতে ঠাসা। শহরের বেশ কিছু এলাকায় ড্রেনেজব্যবস্থা একেবারেই অপরিকল্পিত। ফলে বৃষ্টির পানি নামতে দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে এবং কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে। টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে থমকে গেছে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘরের বাইরে বের হতে পারছেন না। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুরু হওয়া ভারী বর্ষণে যশোর সদরের অধিকাংশ সবজিক্ষেত পানির নিচে চলে যায়। কৃষকদের আশঙ্কা, আরও দুই-এক দিন ভারী বৃষ্টি হলে উঁচু জমির পটল ও উচ্ছের ক্ষেতও জলাবদ্ধ হয়ে পড়বে। ইতোমধ্যে নিচু জমির অনেক সবজি ক্ষেত তলিয়ে গেছে। চুড়ামনকাটির দোগাছিয়া গ্রামের কৃষক মিলন আক্তার জানান, বৃষ্টির পানিতে তার এক বিঘা পটল ক্ষেতের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে গাছ পচে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। বরবটি চাষি দেলোয়ার গাজী বলেন, অতিবৃষ্টির কারণে গাছের ফুল ঝরে যাচ্ছে। এতে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে গাছও মারা যেতে পারে, যা তার জন্য বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণ হবে। আব্দুলপুর গ্রামের চারা উৎপাদনকারী কৃষক টিটো জানান, এভাবে বৃষ্টি চলতে থাকলে বাঁধাকপি ও ফুলকপির চারা রক্ষা করা সম্ভব হবে না। ইতোমধ্যে নতুন করে বপন করা বীজ অনেক চাষিরই নষ্ট হয়ে গেছে। কাশিমপুর গ্রামের রেজাউল ইসলাম বলেন, মাঠের পর মাঠ পানিতে থৈথৈ করছে। ধানের বীজতলাগুলোও সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে। কৃষিবিদ ইউসুফ আলী বলেন, দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধ থাকলে সবজি গাছের গোড়া নরম হয়ে যায়। পরে রোদ উঠলে দ্রুত পচন ধরে গাছ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আষাঢ়ের এ বৃষ্টিতে সবজি চাষিদের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। সরেজমিনে দেখা গেছে, এলাকার নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে। এক দিনের ভারী বৃষ্টিতেই নিম্নআয়ের অনেক মানুষ ঘরবন্দী হয়ে পড়েছেন। পৌরসভার দেয়া তথ্য মতে, যশোর পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডে মোট ড্রেনের দৈর্ঘ্য ২৫১.৯৬ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৪৯.২২ কিলোমিটার আরসিসি ড্রেন, ৬৯.২৫ কিলোমিটার ইটের গাঁথুনির ড্রেন, পাঁচ কিলোমিটার পাইপ ড্রেন এবং ১২৮.৪৯ কিলোমিটার এখনো কাঁচা ড্রেন। অর্থাৎ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার অর্ধেকেরও বেশি অংশ এখনো কাঁচা অবস্থায় রয়েছে, যা বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশনে বাধা তৈরি করছে। পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে শুধু ড্রেন পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণে ২ কোটি ২৬ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। যার মধ্যে ইতিমধ্যে ১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। পাশাপাশি ৫, ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডে প্রায় সাত কিলোমিটার নতুন আরসিসি ড্রেন নির্মাণে ২০ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। জলাবদ্ধতার বিষয়ে পৌরসভার প্রকৌশলী (পানি ও পয় নিস্কাশন) এস এম কামাল হোসেন বলেন, যশোর পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী বিএম কামাল আহম্মেদ বলেন, পৌরসভা থেকে প্লাবিত এলাকাগুলো পৌর প্রশাসকের নেতৃত্বে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আশা করছি দ্রুতই পানি নেমে যাবে। মেডিকেল কলেজের পাশে একটি সরু ড্রেন রয়েছে। কিন্তু সেটাকে সম্প্রসারিত করতে দেয়নি এলাকাবাসী। ওই ড্রেনটা সম্প্রসারণ করা হলে এ সমস্যা আর থাকবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। বর্ষা মৌসুমের আগেই শহরের অধিকাংশ ড্রেন পরিস্কার করা হয়েছে। কিন্তু জনগনের অসচেতনতার কারণে এসব ড্রেন ফের প্লাস্টিক, পলিথিন ও বর্জ্যে ভরে গেছে। তাছাড়া অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে পানি জমে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশনে সময় লাগছে। আশা করা যায় নতুন করে বৃষ্টিপাত না হলে ২৪ ঘন্টার মধ্যে শহরের রাস্তাঘাটের পানি নেমে যাবে।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়