প্রতিদিনের ডেস্ক
ঢাকায় ইসলামী আন্দোলনের মহাসমাবেশে যোগ দিতে শুক্রবার (২৭ জুন) রাতে যশোর থেকে হামদান এক্সপ্রেসের একটি রিজার্ভ বাসে রওনা হন অর্ধশতাধিক নেতা-কর্মী। মুন্সীগঞ্জের সিংপাড়া-নওয়াপাড়ায় পৌঁছে একটি ট্রাকের পেছনে ধাক্কা দিলে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বাস দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭ জনে দাঁড়িয়েছে। এদিকে যশোর নওয়াপাড়া ইউনিয়নে নিহত ৪ জনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় শোকের মাতম। তখন পর্যন্ত ৪ জন নিহতের খবর ছিল কিন্তু বেলা গড়িয়ে দুপুর হতেই নিহতের সংখ্যা জানা যায় ৭ জন। নিহতদের সবাই যশোরের। এতে আহত হয়েছেন আরও ১৪ জন।

শনিবার (২৮ জুন) ভোররাতে এ দুর্ঘটনাটি ঘটে এক্সপ্রেসওয়ের হাসাড়া ব্রিজ-২ এর কাছে। প্রাথমিকভাবে ৪ জন মৃত্যুর খবর জানা গেলেও পরবর্তীতে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ জনে। নিহতরা হলেন-যশোর সদর উপজেলার মধুগ্রাম আড়পাড়ার বজলুর রহমানের ছেলে মুজাহিদ জিল্লুর রহমান (৬৫), ইসলামী আন্দোলন নোয়াপাড়া ইউনিয়ন সভাপতি ও পাগলাদাহ গ্রামের ইনসান আলীর ছেলে ডা. আব্দুল জালাল উদ্দিন (৬৫), একই গ্রামের মো. বাপ্পির ছেলে হাসিব (৩২), শেখহাটির ডা. আব্দুল হালিম মোস্তফা (৫৫), ইসলামী আন্দোলন যশোর জেলা দায়িত্বশীল সদস্য মাওলানা মোস্তফা (৩৪), মুফতি আব্দুর রহমান (৫২), মুফতি আবু বকর (৪৩)। আহতদের মধ্যে ১০ জনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

ঘটনাস্থলে হাইওয়ে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় প্রশাসন উদ্ধার কাজ চালায়। এ ঘটনায় গোটা যশোর জুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহতদের প্রত্যেকেই ইসলামী আন্দোলনের স্থানীয় নেতা ও কর্মী ছিলেন। যাঁরা মহাসমাবেশে অংশ নিতে রাতে ঢাকায় যাচ্ছিলেন। শনিবার (২৮ জুন) দুপুরে পাগলাদাহ গ্রামের পূর্বপাড়ায় নিহত জালালের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের ওপর শামিয়ানা টাঙাচ্ছেন কয়েকজন যুবক। কেউ কবর খুঁড়ছেন, কেউবা কয়েকটি বড় হাঁড়িতে পানি গরম করছেন। সড়কের ওপর সারিবদ্ধভাবে রাখা চেয়ারে বসে আছেন গোটা বিশেক মানুষ। বাড়ির ভেতরে নারীদের আহাজারি। সেখানে কথা হয় ইসলামী আন্দোলনের এক কর্মীর সাথে। দুর্ঘটনায় তিনি সামান্য আহত হন। পরে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে পাগলাদাহ গ্রামে বাড়িতে চলে আসেন। তিনি বলেন, ‘সমাবেশে যোগ দেওয়ার জন্য ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা থেকে হামদান এক্সপ্রেস নামের একটি বাস রিজার্ভ করে রওনা দিই ইসলামী আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা। বাসে উঠে ঘুমিয়ে পড়ি। মাঝে মহাসড়কের পাশে একটি দোকানে সবাই নেমে চা-বিস্কুট খাই। পরে আবার গাড়িতে উঠি। সিংপাড়া-নওয়াপাড়া ও হাঁসাড়া ব্রিজ-২-এর মধ্যবর্তী স্থানে এই দুর্ঘটনা ঘটে। হামদান এক্সপ্রেস চলন্ত এক ট্রাকের পেছনে ধাক্কা দেয়। এতে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এক্সপ্রেসওয়ের মাঝখানের সড়কদ্বীপে রেলিংয়ের সঙ্গে আলাদাভাবে ধাক্কা খায়। দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই মারা যান দুজন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও দুজন মারা যান।’ নিহত জালালের বড় ভাই মাকসুদুর রহমান বলেন, ‘এলাকায় আলেম ও চিকিৎসক হিসেবে সম্মানিত মানুষ জালাল। ভোররাতে সমাবেশে যাওয়ার পথে সে ও তার কর্মীদের দুর্ঘটনায় নিহতের খবরে আমরা ভেঙে পড়েছি। এলাকায় মাতম চলছে। আহত ও নিহত ব্যক্তিদের জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই।’ এদিকে দুর্ঘটনায় প্রথমে গুরুতর আহত হন বাসটির চালকের সহকারী হাসিব। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ছোটবেলা এক দুর্ঘটনায় বাবা বাপ্পিকে হারান হাসিব। পরে পোশাক কারখানায় কাজ করে হাসিবকে বড় করেন মা শায়লা বেগম। এখন তিনি বয়সের কারণে নানা রোগে অসুস্থ। হাসিবের অসুস্থ মা, স্ত্রী ও আড়াই বছরের একটি মেয়ে রয়েছে। তিনি পরিবারের হাল ধরতে কিছুদিন আগে বাসে চাকরি নেন। এখন দুর্ঘটনায় তাঁকে হারিয়ে পাগলপ্রায় মা ও স্ত্রী।হাসিবের শাশুড়ি মর্জিনা বেগম বলেন, ‘হাসিবই ছিল সব। এভাবে তার প্রাণ দিতে হবে জানলে বাসে চাকরি নিতে দিতাম না। আমাগের এখন কী হবে? তার মেয়েটার কী হবে? তারে হারিয়ে তো আমরা অথই সাগরে পড়ে গেলাম।’ মেয়েকে কোলে নিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন হাসিবের স্ত্রী। তিনি নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলেন, ‘শুক্রবার রাতে একবার কথা হয়েছিল। বলেছিল, “যেহেতু হুজুরদের প্রোগ্রাম, শেষ না হলে আর ফিরা হবে না।” তবে সে যে আর ফিরবে না, সেটা তো বলেনি। এখন আমার মেয়েটার কী হবে, আমার কী হবে?’
এ বিষয়ে যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসনাত বলেন, ‘গণমাধ্যমে শুনেছি যশোরের চারজন নিহত হয়েছেন। পুলিশ সদস্যরা নিহতের বাড়িতে গিয়েছিলেন।’ যদিও তখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৪ জন ছিল। পরে তা বেড়ে হয় ৭ জন। মুন্সীগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ সফিকুল ইসলাম জানান, যশোর থেকে ঢাকাগামী নাইটকোচটি হাসাড়া সেতুর কাছে চলন্ত একটি ট্রাকের পেছনে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে বাস ও ট্রাক দুটোই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রেলিংয়ে আঘাত হানে। এসময় ঘটনাস্থলেই দু’জনের মৃত্যু হয় এবং পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও পাঁচজন মারা যান।

