# নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের ক্লিয়ারেন্স
সুন্দর সাহা
জোড়াতালি দিয়েই চলছে যশোর সদর হাসপাতালের সামনে অবস্থিত অসীম ডায়াগনস্টিক সেন্টার এন্ড হসপিটাল। হাসপাতালের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ। মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্সও। এক্স-রে বিভাগের আপডেট অনুমোদন নেই। স্বাস্থ্য বিভাগের চাহিদা মোতাবেক নেই পর্যাপ্ত ডাক্তার, নার্স ও প্যাথলজিকাল স্টাফ। ৩০ বেডের এই হসপিটালটিতে স্বাস্থ্য বিধির বালাই নেই। সর্বত্রই নোংড়া আর অপরিস্কার অপরিচ্ছন্নতায় ভরা। অসীম ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কমিশন ভোগী গ্রাম্য চিকিৎসকদের দৌরাত্ম আর দালালদের দাপটে সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের ত্রাহি অবস্থা। এছাড়া এই ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্যথলজিক্যাল টেস্ট নিয়েও রয়েছে নানা রকমের অভিযোগ। ডিপ্লোমা পাস করা বৈধ সনদধারী টেকনিশিয়ানদের স্থলে টেকনিশিয়ানদের আধিক্য এই হসপিটালের সর্বত্রই। অপরিস্কার এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বিরাজ করছে ওটিসহ হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে। ভূক্তভোগীদের অভিযোগ এই হাসপাতালে মানসম্মত চিকিৎসার বদলে গলাকাটা হয় রোগীদের। এখানে চিকিৎসার সেবা প্রদানের নামে গলাকাটা ব্যবসা করছেন মালিক কর্তৃপক্ষ। এছাড়া অপ্রয়োজনীয় টেষ্ট্রের নামে রোগীদের পকেট কাটা হচ্ছে অবিরত। এই হসপিটালে ভুল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যুর একাধিক ঘটনা ঘটলেও মালিক কর্তৃপক্ষ বিগত দিনে আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় থেকে রাজনৈতিক ক্ষমতার জোরে সবই ম্যানেজ করে ফেলেছেন। এমনকি এসব ঘটনায় একাধিক মামলা হলেও অজ্ঞাত কারনে কোন পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়নি পুলিশ প্রশাসন বা জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে। এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনাবলীর লেশ মাত্র মানা হচ্ছে না এই হসপিটালে। অনিয়ম আর চরম অব্যবস্থাপনার নাম যেন যশোর সদর হাসপাতালের প্রধান গেটের সামনেই অসীম ডায়াগনস্টিক সেন্টার এন্ড হসপিটাল। যার পূর্বের নাম ছিলো ইবনেসিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টার। সেই ডায়াগনস্টিক সেন্টারটি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ৩০ বেডের হাসপাতালে রুপান্তরিত করা হয়েছে কয়েক বছর আগেই। যাতে স্বাস্থ্য বিভাগের নীতিমালা লঙ্ঘন করা হয়েছে পদে পদে। স্বাস্থ্য বিভাগের নীতিমালায় বলা আছে, প্রতি ১০ বেডের বেসরকারী হাসপাতালে সার্বক্ষনিক দায়িত্ব পালনের জন্য কমপক্ষে ৩ জন মেডিকেল অফিসার এবং ৬জন ডিপ্লোমা নার্স নিয়োগ করা বাধ্যতামুলক। সে হিসেবে এই হাসপাতালটির জন্য প্রয়োজন কমপক্ষে ৯ জন মেডিকেল অফিসার এবং ১৮জন ডিপ্লোমা নার্স। যার একজনও আছে কিনা সন্দেহ। এছাড়া এক্স-রে বিভাগ, প্যাথলজিক্যাল টেষ্ট ল্যাব, ইসজি, ইকো, আল্ট্রাসনোগ্রাফি থেকে শুরু করে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যে সব টেষ্ট করা হবে সেসব সেক্টরে প্রশিক্ষন প্রাপ্ত বৈধ সনদধারী টেকনিশিয়ান নিয়োগ প্রদান করতে হবে। এছাড়া সার্বক্ষনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত এক বা একাধিক এমবিবিএস সনদধারী প্রাথলজিষ্ট ও সনোলজিষ্ট নিয়োগ থাকতে হবে। থাকতে হবে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও ফায়ার ব্রিগেডের অনুমোদনসহ সরকারের পরমানু কমিশনের অনুমোদন। কিন্তু অসীম ডায়াগনস্টিক সেন্টার এন্ড হসপিটালের এসবের বৈধ সনদপত্রের লেশমাত্র নেই। ডায়াগনস্টিক সেন্টার এন্ড হসপিাটল স্থাপনের শুরুতে বিভিন্ন কায়দায় এসব লাইসেন্স সংগ্রহ করলেও বর্তমানে তার অধিকাংশই মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। কোন কোন লাইসেন্সের মেয়াদ ৩/৪ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। কিন্তু সেগুলো নবায়ন করা হয়নি। আর পরিবেশ অধিদপ্তরে আবেদন করেই শেষ। কিন্তু অদ্যাবধি পরিবেশ অধিদপ্তরের কোন ছাড়পত্র বা ক্লিয়ারেন্স নেই। তারপরও দিব্বি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে এই প্রতিষ্ঠানটি। যশোর সদর হাসপাতালে কর্মরত একাধিক ডাক্তার নিয়মিত রোগী দেখছেন এই ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। যা নিয়ে খোদ রোগী ও তার স্বজনদের মধ্যেই প্রশ্ন রয়েছে। লাইসেন্সের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়া একটি প্রতিষ্ঠানে কিভাবে সরকারী হাসপাতালের চিকিৎসকরা রোগী দেখছেন বা ওটি করছেন। এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই হসপিটালের মুল স্বাস্থ্য বিভাগের অনুমোদনের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২২ সালে। আর পরমানু কমিশনের অনুমোদনের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৩ সালে। কিন্তু অদ্যাবধি তা আর নবায়ন করা হয়নি। এসব নবায়ন না করেই চলছে সব কার্যক্রম আগের মতোই। এসব বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে অসীম ডায়াগনস্টিক সেন্টার এন্ড হসপিটালের স্বত্বাধিকারী অসীম কুমার মন্ডল বলেন, ‘আমাদের সবই ছিলো। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না মেলায় সবই হেল্ডআপ রয়েছে। বার বার যোগাযোগ করেও জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে আমাদের মুল লাইসেন্সটি নবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া পরমানু কমিশনে আবেদন করা রয়েছে। হসপিটালের লাইসেন্স এর মেয়াদও পার হয়ে গেছে। কিন্তু স্বাস্থ্য বিভাগ তো পরিবেশের ছাড়পত্র না থাকায় এসব লাইসেন্স নবায়ন করছে না। তাহলে আমাদের কি করার আছে। আমরা তো নিয়মিত ভ্যাট আইটি এবং পৌর ট্যাক্স পরিশোধ করছি।’ অপর এক প্রশ্নের জবাবে অসীম কুমার মন্ডল বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগের সকল বিধিবিধান মেনে প্রতিষ্ঠান চালানো সম্বব নয়। যশোরে যারা এই সেক্টরে কাজ করছে তাদের প্রায় সবারই এই সমস্যা আছে। কিন্তু আমাদের চেষ্টার কোন ত্রুটি নেই। দক্ষজনবল ও কাঙ্খিত জনবল সম্পর্কীত এ প্রশ্নের জবাবে এই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অসীম কুমার মন্ডল বলেন, আমাদের এই ৩০ বেডের হসপিটালের জন্য সার্বক্ষনিক ৩ জন মেডিকেল অফিসার ও ৬ জন ডিপ্লোমা পাস নার্সসহ প্রয়োজনীয় সব স্টাফ নিয়োগ করা আছে। কিন্তু তিনি তাদের বৈধ নিয়োগপত্র, যোগদানপত্র, বেতন রেজিস্ট্রারসহ আনুসঙ্গিক ফাইলপত্র দেখাতে পারেননি। তিনি বলেন, কয়েকদিন পরে আসেন, সব ঠিকঠাক করে দেখাতে পারবো। কেবলমাত্র গ্রাম্য কোয়াক ডাক্তারদের ওপর ভর করে খোদ শহরের বুকে এমন একটি হসপিটালের কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় স্বাস্থ্য বিভাগের সক্ষমতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ মানুষসহ ক্ষতিগ্রস্থরা। বিষয়টি নিয়ে জেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটি ও জেলা মাসিক উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির একাধিক সভায়কমিটির সদস্যরা প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে অবৈধ এসব ডায়াগনস্টিক সেন্টার এন্ড হসপিটালের বিরুদ্ধে সরেজমিন পরিদর্শন করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এদিকে খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে, এই প্রতিষ্ঠানে সুন্দর বিল্ডিং থাকলেও নেই কোন মানসম্মত অপারেশন থিয়েটার বা ওটি। এখানে অপারেশন লাইটের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয় সাধারণ লাইট। নেই পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি। পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার বালাই নেই। লাইসেন্স বা প্রয়োজনীয় অনুমোদনহীন এই প্রতিষ্ঠানটি কিভাবে বছরের পর বছর মানুষ ঠকানোর ব্যবসা করছে সে বিষয়ে হসপিটালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, শুরুতে সব ছিলো। পর্যায়ক্রমে সব নষ্ট হয়ে গেছে। নতুন করে সব ঠিকঠাক করার চেষ্টা করছি। তবে স্বাস্থ্য বিভাগের সাথে সুসম্পর্ক থাকায় বিশেষ কোন অসুবিধা হচ্ছে না বেশ গর্বের সাথে একথা বলেন।

