১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ  । ৩০শে নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ 

নওয়াপাড়ায় ব্যবসায়ীকে বুকসমান গর্তে পুঁতে নির্যাতন করে ৪ কোটি টাকা আদায় : সাদা স্ট্যাম্প চেকে স্বাক্ষর আদায়

সুন্দর সাহা
যশোরের অভয়নগরে এক ব্যবসায়ীকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে বুকসমান গর্তে পুঁতে রেখে কয়েক দফায় চার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পদ স্থগিত হওয়া স্থানীয় এক বিএনপি নেতা ও এক সাংবাদিক নেতার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ব্যবসায়ীর স্ত্রী সেনা ক্যাম্পে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী শাহনেওয়াজ কবীর ওরফে টিপু (৪৮) নওয়াপাড়া এলাকার জাফ্রিদী এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী। তিনি ও তাঁর পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ঘটনার পর জীবনের নিরাপত্তার অভাবে এলাকা ছেড়েছেন ওই ব্যবসায়ী। ঘটনার বিচার চেয়ে গত ৩১ জুলাই অভয়নগরের রাজঘাট সেনা ক্যাম্পে লিখিত অভিযোগ দেন ব্যবসায়ী শাহনেওয়াজ কবীরের স্ত্রী আসমা খাতুন। অভিযোগে তিনি বলেন, গত বছর ৫ আগষ্টের পর নওয়াপাড়া পৌর বিএনপির নেতা ও সাবেক পৌর কমিশনার আসাদুজ্জামান জনি এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। তার চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন নওয়াপাড়ার ব্যবসায়ীরা। তারই এক পর্যায়ে গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টার দিকে সৈকত হোসেন ওরফে হিরা নামে এক ব্যক্তি তাঁর স্বামীকে কৌশলে নওয়াপাড়া পৌর বিএনপির (পদ স্থগিত) সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুজ্জামান জনির ব্যক্তিগত কার্যালয়ে নিয়ে যান। সেখানে আসাদুজ্জামান জনি তাঁকে মারধর করেন এবং অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন। এরপর আসমা খাতুন সাউথ বাংলা ব্যাংক থেকে আসাদুজ্জামানের প্রতিষ্ঠানের হিসাবে দুই কোটি টাকা পাঠান। টাকা পেয়ে তাঁরা টিপুকে ছেড়ে দেন। আসমা খাতুন অভিযোগে আরো বলেন, একই বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টার দিকে তাঁর স্বামী চলিশিয়া থেকে মোটরসাইকেলে নওয়াপাড়া বাজারে যাওয়ার পথে সৈকত তাঁর গতি রোধ করেন এবং মোটর সাইকেল থেকে নামিয়ে টিপুকে ধরে জনির কনা ইকোপার্কে নিয়ে আটকে রাখে ও জনির মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেয়। এরপর বেলা ৩টা পর্যন্ত তাঁর মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরে জানতে পারেন, তাঁর স্বামীকে বিএনপি নেতা জনির ইকো পার্কে মুক্তিপণের দাবিতে আটকে রাখা হয়েছে। খবর পেয়ে আসমা সেখানে গেলে জনি, সম্রাট হোসেন ও নওয়াপাড়া প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মফিজ উদ্দিন দপ্তরী তার মাথায় আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে হামলা চালান এবং তাকে শারিরিক ভাবে লাঞ্চিত করেন। এরপর শাহনেওয়াজ কবীরের বুকপর্যন্ত গর্ত খুঁড়ে বালু চাপা দিয়ে আরও দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন বলে অভিযোগ করেন আসমা খাতুন। তিনি বলেন, এ সময় তাঁর স্বামী ব্যবসায়ী শাহনেওয়াজ প্রাণ বাঁচাতে বাধ্য হয়ে নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজারকে ফোন করে ২ কোটি টাকা দিতে বলেন। সাংবাদিক মফিজের হিসাব নম্বরে পূবালী ব্যাংক থেকে ৬৮ লাখ ও সাউথ বাংলা ব্যাংক থেকে ৩২ লাখ টাকা পাঠানো হয়। এ সময় সাংবাদিক মফিজ আরও এক কোটি টাকার দুটি চেকে জোর পূর্বক টিপুকে দিয়ে স্বাক্ষর করিয়ে নেন। এসময় মফিজ চেকের পাশাপাশি জনির নামে কেনা তিনটি ও দিলিপ সাহার নামে কেনা তিনটি ১০০ টাকার ফাঁকা স্ট্যাম্পে সই করিয়ে নেওয়া হয়। এই ঘটনা কাউকে জানালে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। সাংবাদিকদের আসমা খাতুন বলেন, ‘বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান জনি ও সাংবাদিক মফিজের নেতৃত্বে কয়েকজন আমার ব্যবসায়ী স্বামীকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে কয়েক দফায় চার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। আমার স্বামী বর্তমানে ভয়ে এলাকাছাড়া। আমরাও চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে আছি। ব্যবসা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। চার শতাংশ জমির ওপর বাড়ি ছাড়া আর কিছুই এখন নেই আমাদের। আমাদের একমাত্র ছেলে বিবিএ পড়ে। ছেলের বউ বিএ পড়ছে। তাদের পরীক্ষার ফরম পূরণ সামনে। সেই ফরম পূরণের টাকা পর্যন্ত এখন আমি জোগাড় করতে পারছি না। আমরা একেবারে পথে বসে গেছি। সন্ত্রাসী চাঁদাবাজ জনি ও সাংবাদিক মফিজের কারসাজিতে আমরা আজ পথের ফকির। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।’এ বিষয়ে জানতে একাধিকবার বিএনপি নেতা (পদ স্থগিত) আসাদুজ্জামান জনির মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে অভিযুক্ত সাংবাদিক মফিজ উদ্দিন দপ্তরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আপনি যাকে খুঁজছেন আমি সে মফিজ না।’ এসবই আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত। এরপর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এদিকে স্থানীয় একাধিক ব্যবসায়ী ও সাংবাদিকবৃন্দ টিপুর স্ত্রী আসমা খাতুনের অভিযোগ শতভাগ সত্য বলে দাবি করেন। আসমা খাতুন অভিযোগ করেন, ‘সেনা ক্যাম্পে অভিযোগ দিয়েছি। কিন্তু গত তিন দিনেও ওখান থেকে কেউ যোগাযোগ করেননি। থানায় গিয়ে ওসিকে (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) সব কাগজপত্র দিয়েছি। মৌখিক ভাবেও সব জানিয়েছি।’ এই অভিযোগ জানাজানি হওয়ার পর গোটা যশোরে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে যশোর জেলা বিএনপির সভাপতি সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু বলেন, ‘সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে জনির বিরুদ্ধে আগেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সে এখন আমাদের কেউ না।’ তিনি আরও বলেন, ব্যবসায়ীর কাছ থেকে টাকা আদায়ের বিষয়ে কোনো তথ্য জানা নেই। তার কর্মকাণ্ডে আমাদের দল কোনো দায় নেবে না। এ বিষয়ে অভয়নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল আলিম বলেন, ‘অভিযোগটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছি। এখনই এ বিষয়ে বেশি কিছু বলতে পারছি না।’ ধৈয্য ধরুন সব জানতে পারবেন।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়