১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ  । ৩০শে নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ 

বৈষম্য থাকলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয় না

আব্দুল বায়েস
আধুনিক মতবাদ এই যে আপাতদৃষ্টিতে প্রতীয়মান পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও মানুষকে একেবারে সমানভাবে বিবেচনা করতে হবে; আমরা সবাই মানবজাতির অংশ আর তাই অবশ্যই সম-বিবেচনার অধিকারী। এই প্রতিপাদ্যের বিপরীতে অবস্থান নিলে কী পরিণতি হতে পারে তা বিশদভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে। প্রত্যেক মানুষকে সমানভাবে বিবেচনা না করার মধ্যে শুধু যে নৈতিক তাৎপর্য নিহিত থাকে তা কিন্তু নয়, এর অর্থনৈতিক পরিণতি বেশ গভীর। এই অসমতার বেশিরভাগ, বিভিন্ন উপায়ে, অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে বিধায় কেবল ন্যায় বিচারের প্রসঙ্গ জরুরি হয়ে পড়ে। এর মধ্যে সম্পদের বিতরণ সম্পর্কিত ন্যায়বিচার (ডিসট্রিবিউটিভ জাস্টিস ) উন্নয়নকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করে।
দুই.
বিশেষ করে জনগণের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পদের অন্যায্য বিতরণের দিকটা দেখা যেতে পারে। সম্পদ বলতে সাধারণত উৎপাদনে ব্যবহৃত ভৌত, আর্থিক এবং মানব সম্পদ যেমন স্বাস্থ্য, পুষ্টি, দক্ষতা এবং শিক্ষা বুঝায়। সোজা কথায়, সমাজের বেশিরভাগ সম্পদ যদি মুষ্টিমেয় কজনের নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং খুব কম থাকে বেশিরভাগের কাছে, যেমন বর্তমান বাংলাদেশে, তা হলেই বলা যাবে ওটা এক অন্যায্য বিতরণ ব্যবস্থা। এ ধরনের অন্যায্য ব্যবস্থা কেবল যে নীতিহীনতার নিরিখে খারাপ তা নয়, অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যও তা ভালো ফল বয়ে আনে না। তা হলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, কী কী পথে একটা অন্যায্য বিতরণ ব্যবস্থা অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি রোধ করে?
তিন.
প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ এস আর ওসমানী মনে করেন তিনটি পথে অন্যায্য ব্যবস্থা উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে । প্রথমত, ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে সমান সুযোগের অনুপস্থিতে একটা সমাজ সম্ভাবনাময় উৎপাদনশীল বিনিয়োগ থেকে বিচ্যুত হতে পারে। আমরা জীবনের যেকোনো স্তরে মঙ্গল সাধনের নিমিত্ত যাই করতে চাই না কেন, তার জন্য কোনো কিছুতে বিনিয়োগ সুবিধা দরকার । যেমন উৎপাদনশীল হয়ে অধিকতর কৃতিত্ব প্রদর্শনে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ কিংবা অর্থনীতিক ইউনিটের দক্ষতা বৃদ্ধিতে ভৌত পুঁজিতে বিনিয়োগ। মোটকথা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিকল্পে ভৌত ও মানব পুঁজিতে বিনিয়োগের বিকল্প নেই। তবে আমাদের নিজস্ব সম্পদ দিয়ে এসমস্ত বিনিয়োগ সম্ভব হয় না বলেই সঞ্চয়- বিনিয়োগ দূরত্ব দূর করতে ঋণের বাজার থেকে ঋণ গ্রহণ করতে হয়।
এবং এখানেই সম্পদের অত্যন্ত অসম বিতরণ পথের কাঁটা হয়ে দেখা দেয়। ঋণের বাজারে গরিবের প্রতি সুবিচার করা হয় না। তাতে শুধু যে গরিব ক্ষতিগ্রস্ত হয় তা নয়, বরং এ ধরনের পরিস্থিতি সার্বিক অর্থনীতির বিপক্ষে অবস্থান নেয়। যেমন অপ্রতিসম (এসেমেট্রিক) পরিস্থিতি মানে ধনীরা মুক্তভাবে ঋণ নিয়ে পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় বিনিয়োগে করে যাবে অপরদিকে ঋণ বঞ্চিত হয়ে গরিব নিজের এবং অর্থনীতির উন্নয়নে অবদান রাখতে পারবে না। ধনীর জন্য বাইরের অর্থ নাও লাগতে পারে তবু তারা অতি সহজে ঋণের বাজারে সুযোগ প্রাপ্ত অথচ, অপরদিকে, যাদের যথেষ্ট প্রয়োজনীয় সম্পদ নেই , এবং প্রকৃতপক্ষে তা দরকার, সেই গরিব প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের বাজারের বাইরে অপেক্ষায় প্রহর গুনতে হয়।
মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে যে পুরোনো ধারায়ই চলছে দেশ আর তাই পথগুলো পরিষ্কার না করতে পারলে কাঙ্ক্ষিত সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধি বা উন্নয়ন ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। জুলাই স্পিরিট বলে যদি কিছু থেকে থাকে তা হলো একটা ন্যায্য সমাজ প্রতিষ্ঠা কিন্তু বাস্তবে মনে হয় উল্টো পথে চলছে দেশ। নারী মিছিলে থাকে প্রথম সারিতে কিন্তু মুক্তির বেলায় সব শেষে, গরিব নিয়মিত কিস্তি দিয়েও ঋণ পায় না, ধনীর কাছে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ পাঁচ লাখ কোটি টাকা। পুরোনো বন্দোবস্তে নতুন বাংলাদেশের নমুনা! – আব্দুল বায়েস
এর পেছনে কারণ যাই হোক , এতটুকু বলাই যথেষ্ট যে, অনেক গরিব মানুষ ঋণ-বাধার মুখোমুখি (ক্রেডিট কন্সট্রেনট) হওয়ার জন্য মুনাফা মুখি বিনিয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় – হোক সে শিক্ষা , স্বাস্থ্যে কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনের জন্য ভৌত পুঁজিতে বিনিয়োগ । ভৌত ও মানব পুঁজিতে বিনিয়োগের এই প্রতিবন্ধকতা শ্রমশক্তির উৎপাদনশীলতাকে পূর্ণ সম্ভাব্য বিন্দুতে পৌঁছতে দেয় না যার পরিণতিতে অর্থনীতি মার খায় অর্থাৎ অর্থনীতিক প্রবৃদ্ধিও তার পূর্ণ সম্ভাব্য বিন্দুতে যেতে পারে না।
চার.
অন্যায্য বিচারের দ্বিতীয় পথটি হচ্ছে পরিব্যাপক এবং অনড় লিঙ্গ অসমতা । অর্থনৈতিক , সাংস্কৃতিক , ধর্মীয় এবং অন্যান্য কারণে বেশিরভাগ দেশে ,এবং প্রায়শ, পুরুষের বিপরীতে নারী অসুবিধাজনক অবস্থানে থাকে । এর অর্থনীতিক পরিণতি ব্যাপক। অন্যায্যতার একটা প্রকাশ হচ্ছে এই যে, উপার্জনক্ষম কর্মসংস্থানে পুরুষের তুলনায় নারী অনেক কম সুযোগ পায়। তাদেরকে দাবিয়ে রাখতে ধর্মীয়, অর্থনৈতিক– সবকিছু ষড়যন্ত্র করে। এর ফলে যে মাত্রায় শ্রম শক্তিতে ঢুকার কথা পারছে না তার মানে সম্ভাব্য শ্রমশক্তির একটা বড় অংশ নিষ্ক্রিয় থাকছে এবং সেহেতু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সর্বোচ্চ হতে পারছে না। অবশ্য ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ ধরে নারী শ্রম শক্তিতে প্রবেশ করছে কিন্তু পুরুষের ন্যায় মুক্তভাবে করতে এখনও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। এই অন্যায্য অবস্থা যতদিন থাকবে, একটা তাৎক্ষণিক সমস্যা ততদিন সঙ্গী হবে অর্থাৎ, অব্যবহৃত শ্রম শক্তি অর্থনীতিক প্রবৃদ্ধির গতি রুদ্ধ করবে।
তারচেয়েও তাৎপর্যপূর্ণ, নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ শুধু আজকের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ঠেকায় না, বিভিন্ন আন্ত- প্রজন্ম প্রভাবের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধিকেও ব্যাহত করে। প্রকৃতি প্রদত্ত পুনরুৎপাদন এবং প্রতিপালন ভূমিকার জন্য বহুমুখী অসুবিধায় পতিত নারীর ভবিষ্যৎ বংশধরদের সক্ষমতায় বিরূপ প্রভাব রাখে যা প্রকারান্তরে ভবিষ্যতের অর্থনীতির জন্য ভালো কিছু বয়ে আনে না। উদাহরণস্বরূপ, যখন মায়েদের লেখাপড়ায় ঘাটতি থাকে , প্রায়শ দেখা যায়, তাদের সন্তানেরাও যথেষ্ট শিক্ষা পায় না; মায়ের অপুষ্টি মানে শিশুর অপুষ্টি; কম শিক্ষিত এবং কম পুষ্ট মা জন্ম দেয় কম শিক্ষিত এবং কম পুষ্ট শিশু। এবং মেয়েরা যেহেতু ছেলেদের চেয়ে বেশি ভোগে, মেয়েরা যখন মা হয়, অসমতার এই আন্ত-প্রজন্ম চক্র পুনঃপুন সংঘটিত হতে থাকে।
আন্ত-প্রজন্মজগত পুষ্টির প্রভাব শুধু যে ভবিষ্যৎ শিশুদের উপর বর্তায় তা নয়, এই প্রভাবে আক্রান্ত হতে পারে এমনকি ভবিষ্যতের বয়স্করাও। জানা কথা যে অপুষ্ট মা কম ওজনের অপুষ্ট শিশু জন্ম দেন যারা বড় হয় পুষ্টিহীনতা নিয়ে। ইদানীং যা দেখা যাচ্ছে তা হল এই যে এদের মধ্যে অনেকে বয়স্কতা লাভ করার পর অনানুপাতিক হারে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়- যেমন হাইপার টেনশন, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ সমস্যা। এক সময়ের ধনীদের রোগ বলে বিবেচিত এখন দ্রুত বেগে গরিবের ঘরে প্রবেশ করছে ।
মোটকথা, অন্যায্য লিঙ্গ সম্পর্কের একটা প্রবণতা থাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অকার্যকর (ডিসফাংসানাল ) শ্রমশক্তি সৃষ্টি যাদের একটা বড় অংশ কম শিক্ষা, কম পুষ্টির কারণে দুরবল্যকর রোগবালাইতে ভুগে নিম্নমানের মানব পুঁজির ভাণ্ডার খুলে দেবে। আবারও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে কমে যাবে।
পাঁচ.
সর্বশেষ পথটি হচ্ছে প্রচুর মাত্রায় বাড়ন্ত অর্থনৈতিক অসমতা থেকে ব্যাপক রাজনৈতিক অসমতার দিকে যাত্রা। ব্যাপক রাজনৈতিক অসমতা বিভিন্ন উপায়ে আবার অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক অসমতা ঘনিষ্ঠভাবে গ্রথিত এবং একটি অপরটিকে শক্তি যোগায় । অর্থনৈতিক অসমতা থেকে জন্ম নেয়া রাজনৈতিক আধিপত্য এমনিতেই খারাপ তার উপর অর্থনৈতিক উন্নয়নে এ ধরনের আধিপত্য ক্ষতিকর।বিশেষত পুঁজি এবং শ্রমের সম্পর্কে এর একটা অশুভ পরিণতি পরিলক্ষিত হয় শ্রম বাজারে। রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক আধিপত্য মিলে প্রতিযোগিতামূলক বাজারের ভিত্তি দুর্বল করত শ্রমিককে নামে মাত্র মজুরি দিয়ে অনানুপাতিক হারে উৎপাদনের উদ্বৃত্ত উপড়ে নিজ পকেটে ঢুকায়; পথহারা শ্রমিক যা পায় তাই নিয়ে তুষ্ট থাকে। এই অন্যায্য মজুরি শ্রমিকের মনোবল এবং আনুগত্য দুর্বল করে। একটা মনোবলহীন এবং অবাধ্য শ্রম শক্তি কখনও অব্যাহত অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তি হতে পারে না।
অপর এক ক্ষতিকর পরিণতি হচ্ছে এটা সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রতি হুমকি। যখন কিছু সংখ্যক সব দিক থেকে সবার উপর ছড়ি ঘুরায়, এবং তা অনড় ও ভয়ংকর রূপ ধারণ করে, সমাজের বৃহৎ বঞ্চিত অংশ ফুঁসতে থাকে। আক্রোশের ধীরে ধীরে প্রজ্বলিত শিখা ছাইচাপা আগুনের মত থাকলেও একসময় না এক সময়, সুযোগ মুহূর্তে, বিস্ফোরিত হয়ে পুরো সমাজকে গ্রাস করে ফেলে- যেমন ঘটেছিল অষ্টাদশ শতকে ফরাসি বিপ্লব এবং অপেক্ষাকৃত অধুনা আরব বসন্তের বেলায় ।
লেখক : অর্থনীতিবিদ, কলামিস্ট। সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়