দেশের অর্থনীতি ধুঁকছে। শিল্প-ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা খারাপ। বিনিয়োগে স্থবিরতা। একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে না। এরই মধ্যে কাজ হারিয়েছে লক্ষাধিক শ্রমিক। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, ঋণের উচ্চ সুদহার, আইন-শৃঙ্খলার অবনতিসহ নানা কারণে ব্যবসায়ী-শিল্পোদ্যোক্তারা চরম শঙ্কা নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। এরই মধ্যে নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বা শক্তিগুলোর মধ্যে বিভেদ তত বাড়ছে। পরস্পরবিরোধী অবস্থান থেকে রাজপথে নামার বা শক্তি প্রদর্শনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ফলে নির্বাচন নিয়ে যেমন অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে, তেমনি রাজনৈতিক অঙ্গন নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এসব কারণে ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা আরো বেশি উৎকণ্ঠায় রয়েছেন। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অর্থায়ন সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং রাজস্ব আদায়ের ধীরগতি—সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি এখন বহুমুখী সংকটে পড়েছে। সম্ভাবনাময় অনেক শিল্প-কারখানা যেমন অর্থাভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না, তেমনি বহু প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান নতুন করে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছে না। এমন সময় এই রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনতে পারে। অতীত অভিজ্ঞতায় তাঁরা বলছেন, সাধারণভাবে প্রতিটি নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তরকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অস্থিরতা চরম আকার ধারণ করে। আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তাঁরা তেমন কিছু আশা করছেন না। আগামী নির্বাচনে পিআর পদ্ধতি চালু, জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা এবং জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদসহ নির্বাচনসহ পাঁচটি দাবিতে জামায়াতে ইসলামীসহ চারটি ইসলামী দল তাদের আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। অন্য তিনটি দল হচ্ছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। সোমবার প্রায় একই সময়ে পৃথকভাবে দলগুলো এসব কর্মসূচি ঘোষণা করে। তিনটি দলই ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল, ১৯ সেপ্টেম্বর দেশের সব বিভাগীয় শহর ও মহানগরীতে বিক্ষোভ মিছিল এবং ২৬ সেপ্টেম্বর দেশের সব জেলা বা উপজেলায় বিক্ষোভ মিছিলের ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে এসব দাবির কোনো কোনোটি সম্পর্কে বিএনপি এবং সমমনা দলগুলোর আপত্তি রয়েছে। সোমবার বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর বিজভী বলেছেন, একটি ইসলামী দল সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতির জন্য তুমুল আন্দোলনের কথা বলছে। তিনি বলেন, এটি একটি সুপরিকল্পিত মাস্টারপ্ল্যান, যা কারো জন্যই কল্যাণ বয়ে আনবে না। নিট পোশাক মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক বলেন, ‘আমরা শঙ্কিত, আগামী নির্বাচনকেন্দ্রিক কিছু দাবি নিয়ে যে যুগপৎ আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তা উদ্বেগজনক। খোদ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাই যদি উদ্বিগ্ন হন, তাহলে আমাদের উদ্বেগ আরো বেড়ে যায়।’ এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আশা করব, তারা যার যার জায়গা থেকে সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ঠিক রাখতে দায়িত্বশীল ও সহনশীল আচরণ করবে।’
দেশের অর্থনৈতিক সূচকগুলোর বেশির ভাগই এখন নিম্নমুখী। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি তলানিতে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতেও ধস নেমেছে। এ রকম পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দেশের অর্থনীতির জন্য ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনবে। জনজীবন বিপর্যস্ত হবে। রাজনীতি মানুষের কল্যাণের জন্য, মানুষকে বিপদগ্রস্ত করার জন্য নয়। আমরা আশা করব, রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ সহনশীলতার পরিচয় দেবেন। সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

