চিররঞ্জন সরকার
নোবেল পুরস্কার নিঃসন্দেহে পৃথিবীর সবচেয়ে নামী ও দামী পুরস্কার। এ পুরস্কার যারা পান, তাদের নিয়ে দুনিয়াজুড়ে আলোচনা হয়। তবে চিকিৎসা, সাহিত্য, কিংবা শান্তিতে নোবেল নিয়ে যতটা আলোচনা হয়, ফিজিক্স, রসায়ন কিংবা অর্থশাস্ত্রের নোবেল নিয়ে ততটা আলোচনা হয় না। সবচেয়ে কম আলোচনায় আসে সম্ভবত অর্থনীতিতে নোবেল। অথচ এই পুরস্কার আমাদের জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় ‘অর্থনৈতিক উন্নতি’ নিয়ে কাজ করা গবেষকদের দেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, ১৮৯৫ সালে বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেল যে ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যময় চুক্তিনামায় সই করে গেছেন, সেখানে রসায়নশাস্ত্র, প্রকৃতিবিজ্ঞান (ফিজিক্স), চিকিৎসাশাস্ত্র, সাহিত্য ও বিশ্বশান্তিতে পুরস্কার দেওয়ার কথা বলা হলেও অর্থশাস্ত্রে নোবেলের কোনো বিধান ছিল না। সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ব্যাংক অব সুইডেন’ ১৯৬৮ সালে এ পুরস্কারের সূচনা করে। এর পোশাকি নাম হলো ‘আলফ্রেড নোবেল স্মরণে অর্থনীতিতে ব্যাংক অব সুইডেন পুরস্কার’, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘ব্যাংক অফ সুইডেন প্রাইজ ইন ইকোনমিক সায়েন্সেস ইন মেমোরি অফ আলফ্রেড নোবেল’ বা ‘নোবেল মোমোরিয়াল প্রাইজ ইন ইকোনমিক সায়েন্সেস।’ তবে ধীরে ধীরে এটিও নোবেল পুরস্কারের মধ্যে আত্মীকরণ ঘটে।
২০২৫ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পেয়েছেন তিনজন বিখ্যাত গবেষক: জোয়েল মোকির (যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি); ফিলিপ অ্যাঘিয়ন (ফ্রান্সের কলেজ দ্য ফ্রান্স এবং লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স); পিটার হাউইট (যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটি)। নোবেল কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ‘উদ্ভাবনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যাখ্যা’ করার জন্য এ বছরের নোবেল প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যার অর্ধেক মোকিরকে ‘প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি’ নির্ধারণের জন্য। বাকি অর্ধেক যৌথভাবে পেয়েছেন অ্যাঘিয়ন ও হাউইট, যারা ‘সৃজনশীল ধ্বংসের মাধ্যমে টেকসই প্রবৃদ্ধির তত্ত্ব উপস্থাপন করার জন্য।
উদ্ভাবন মানে হলো নতুন কিছু তৈরি করা। যেমন: নতুন মেশিন, নতুন প্রযুক্তি, নতুন ধারণা বা আইডিয়া, নতুন ব্যবসা। যেমন, মোবাইল ফোন একসময় ছিল না। এখন এটা ছাড়া আমরা চলতেই পারি না। এটি একটি বড় উদ্ভাবন। আবার ধরুন, বিদ্যুৎচালিত গাড়ি, অনলাইন ব্যাংকিং, কিংবা ঘরে বসে ভিডিও কল—এসবই উদ্ভাবনের ফল। এসব উদ্ভাবন আমাদের জীবন যেমন সহজ করেছে, তেমনি দেশের অর্থনীতিতেও এনেছে গতি।
তাহলে নোবেল বিজয়ীরা কী কাজ করেছেন? তাদের গবেষণা মূলত এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে: ‘একটি দেশ কীভাবে উন্নতি করে? কীভাবে টেকসই (দীর্ঘদিন চলতে পারে এমন) অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আসে?”
জোয়েল মোকির একজন ইতিহাসবিদ। তিনি অতীত ঘেঁটে দেখেছেন, কেন ইউরোপে শিল্প বিপ্লব হলো, আর চীন বা ইসলামি দুনিয়ায় হলো না, যদিও সেখানেও উদ্ভাবন ছিল।আসলে অর্থনীতিতে নোবেল মানে শুধু গবেষণার স্বীকৃতি নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্য পথ দেখানো। এই বছরের তিন বিজয়ী আমাদের বলছেন, উন্নয়ন চাইলেই হয় না, তৈরি করতে হয় একটি উদ্ভাবনবান্ধব সমাজ। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এটি একটি বড় বার্তা দিয়েছে, আমাদের এখন প্রয়োজন চিন্তাকে গুরুত্ব দেওয়া, নতুনকে জায়গা দেওয়া, এবং প্রতিটি তরুণকে সুযোগ দেওয়া যেন তারা হয়ে উঠতে পারে আগামী দিনের উদ্ভাবক।
তার গবেষণায় দেখা যায়: ইউরোপে লেখক, বিজ্ঞানী, উদ্ভাবকরা নিজেদের মধ্যে চিন্তা বিনিময় করতেন। তাঁরা একে অপরের কাছ থেকে শিখতেন, যুক্তি দিয়ে তর্ক করতেন। রাজারা তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন।এর ফলে ইউরোপে একটি “উদ্ভাবনবান্ধব পরিবেশ” তৈরি হয়। এই কারণেই সেখানে শিল্পবিপ্লব হলো, কলকারখানা গড়ে উঠল, আর শুরু হলো টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন।মোকিরের বিখ্যাত বই ‘এ কালচার অফ গ্রোথ’-এ এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে। ফিলিপ অ্যাঘিয়ন ও পিটার হাউইট এই দুজন মিলে একটি গাণিতিক মডেল তৈরি করেছেন, যার নাম ক্রিয়েটিভ ডিসট্রাকশন মডেল (সৃজনশীল ধ্বংস) ।
‘ক্রিয়েটিভ ডিসট্রাকশন’ কথাটা অবশ্য অর্থনীতিতে নতুন নয়। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবেক অধ্যাপক বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ জোসেফ শুম্পেটার ১৯৪০-এর দশকে উৎপাদনশীলতা এবং উদ্ভাবনের উপর এর প্রভাব পর্যবেক্ষণ করে এই শব্দটি তৈরি করেছিলেন। তিনি ‘ক্রিয়েটিভ ডিসট্রাকশন’ বা সৃজনশীল ধ্বংস বলতে পুঁজিবাদের গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবনের পথ পরিষ্কার করার জন্য প্রতিষ্ঠিত অনুশীলনগুলিকে ভেঙে ফেলাকে বুঝিয়েছিলেন। তাঁর তত্ত্ব মতে, সৃজনশীল ধ্বংস হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে নতুন আবিষ্কার বা প্রযুক্তি পুরোনো পদ্ধতি, পণ্য বা ব্যবসাকে সরিয়ে দেয়। এর ফলে সমাজ ও অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। আরও সহজ করে বললে: নতুন জিনিস এলে পুরোনো জিনিস বাদ পড়ে যায়, কিন্তু এতে উন্নয়ন হয়।বিষয়টি উদাহরণ দিয়ে সহজ করে বুঝে নেওয়া যাক। নেটফ্লিক্স আসার পর ভিডিও ভাড়া দোকান (যেমন সিডি/ডিবিডি ভাড়া) বন্ধ হয়ে গেছে। আবার স্মার্টফোন আসায় ক্যামেরা, ঘড়ি, ক্যালকুলেটর, রেডিও— সবকিছুর চাহিদা কমে যায়। উন্নত বিশ্বে অনলাইন শপিং (দারাজ, অ্যামাজন, আলি বাবা) জনপ্রিয় হওয়ায় অনেক দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে উবার/পাঠাও আসার ফলে অনেক জায়গায় ট্যাক্সি বা রিকশা ব্যবসা কমে গেছে।
নতুন কিছু তৈরি করতে গেলে অনেক সময় পুরোনো জিনিস ভাঙতে হয়—এটাই সৃজনশীল ধ্বংস। যদিও এর ফলে সাময়িকভাবে চাকরি হারানো এবং অন্যান্য অপ্রত্যাশিত পরিণতি হতে পারে, তবে এটি শেষ পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং উন্নত উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে।আসলে ‘ক্রিয়েটিভ ডিসট্রাকশন’ বা সৃজনশীল ধ্বংস কথাটা শুনতে একটু ভয়ংকর মনে হলেও এটা আসলে নতুন সৃষ্টিরই একটা বার্তা। পুরোনো কিছু ধ্বংস হয়, বাদ হয়ে যায়, নতুন প্রয়োজনে নতুন কিছু আসে। আর এই পরিবর্তনই অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়। একসময় মানুষ কেরোসিনের আলোয় পড়ত। এখন সোলার ল্যাম্প বা এলইডি। একসময় আমরা চিঠি লিখে যোগাযোগ করতাম, এখন ই-মেইল, হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করি। পুরোনো টেলিফোনের দোকান বন্ধ হয়েছে, কিন্তু নতুন মোবাইল কোম্পানি তৈরি হয়েছে।
এই পুরানোকে সরিয়ে নতুন আসার প্রক্রিয়াই হচ্ছে সৃজনশীল ধ্বংস। অ্যাঘিয়ন ও হাউইট দেখিয়েছেন, এই প্রক্রিয়াই অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনে, নতুন চাকরি তৈরি করে, এবং উন্নয়নের পথ খুলে দেয়।তাহলে প্রশ্ন আসে এই গবেষণার আমাদের জীবনে কী কাজে লাগবে? আমরা প্রায়ই শুনি, ‘দেশ উন্নত হচ্ছে না’, ‘চাকরি নেই’, ‘উন্নয়ন থেমে গেছে’— এসব সমস্যার মূল কারণ হতে পারে উদ্ভাবনের অভাব। এই তিন গবেষক বলছেন: শুধু পুঁজি বা শ্রম দিয়ে অর্থনীতি বড় হয় না। আমাদের দরকার এমন পরিবেশ, যেখানে মানুষ নতুন কিছু তৈরি করতে পারে। এ জন্য সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান—সবাইকে উদ্ভাবনকে উৎসাহ দিতে হবে।
এখানে বলা ভালো, বাংলাদেশেও অনেক মেধাবী মানুষ আছেন। অনেক তরুণ উদ্যোক্তা নতুন নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করছেন। কিন্তু তারা অনেক সময় পৃষ্ঠপোষকতা পান না, তথ্য ও প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার পান না, নতুন ব্যবসা শুরু করতে নানান বাধার মুখে পড়েন।এই অবস্থায়, যদি সরকার উদ্ভাবনের জন্য একটি ভালো পরিবেশ তৈরি করে, বিশেষ করে ভালো শিক্ষা ও গবেষণায় বিনিয়োগ করে, ব্যবসার শুরুতে সহায়তা প্রদান করে, তাহলে বাংলাদেশেও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব।এবারের অর্থনীতি বিজ্ঞানে নোবেল সেই সম্ভাবনার কথাই ঘোষণা করেছে। নোবেল কমিটির ভাষায়: ‘এই বিজয়ীরা আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন এমন কিছু নয় যা নিজে নিজেই চলে আসে। এর জন্য প্রয়োজন উদ্ভাবন, প্রতিযোগিতা ও শক্তিশালী নীতি।’ তারা আরও বলেছেন: ‘মানব ইতিহাসের বড় সময়জুড়ে উন্নয়ন ছিল না। উন্নয়ন এসেছে তখনই, যখন সমাজ উদ্ভাবনকে গুরুত্ব দিয়েছে।’
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালে পুরস্কার পেয়েছিলেন এসেমোগলু, জনসন ও রবিনসন, যারা দেখিয়েছিলেন, একটি দেশের উন্নয়ন নির্ভর করে তার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর। আর এই বছরের পুরস্কার আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছে। যেমন, উন্নয়ন মানে শুধু বড় বড় বিল্ডিং নয়, এর পেছনে থাকে চিন্তা, গবেষণা ও উদ্ভাবন। উন্নয়নের জন্য পুরানোকে ধরে না রেখে নতুনকে জায়গা দিতে হবে, নতুন প্রযুক্তি ও নতুন ব্যবসাকে উৎসাহিত করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষা ও গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কারণ এখান থেকেই আসে নতুন আইডিয়া। আমাদের দেশে যে জিনিসটার সবচেয়ে বড় ঘাটতি লক্ষ করা যায়।
বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এটি একটি বড় বার্তা দিয়েছে, আমাদের এখন প্রয়োজন চিন্তাকে গুরুত্ব দেওয়া, নতুনকে জায়গা দেওয়া, এবং প্রতিটি তরুণকে সুযোগ দেওয়া যেন তারা হয়ে উঠতে পারে আগামী দিনের উদ্ভাবক।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট।

