হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে গত শনিবার যে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে, তাকে অনেকেই কেবল দুর্ঘটনা হিসেবে দেখতে নারাজ। তাঁদের মতে, এখানে রয়েছে চরম অদক্ষতা, অবহেলা, পরিকল্পনাহীনতা, বিমানবন্দরের ‘সিস্টেমিক’ অব্যবস্থাপনা, আধুনিকায়নে অনীহা এবং ঝুঁকিপূর্ণ বস্তু ব্যবস্থাপনায় চূড়ান্ত ধরনের ব্যর্থতা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনুমান, ক্ষয়ক্ষতি শতকোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। তা ছাড়া দেশের ভাবমূর্তিরও অনেক বড় ক্ষতি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা একে একটি ‘ওয়েক আপ কল’ হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, দ্রুত পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না নিলে যেকোনো সময় আরো বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁদের মতে, অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বিমানবন্দরের কাস্টমস গুদাম ও হ্যাঙ্গার কমপ্লেক্স।
কাস্টমসের গুদামে নিয়মবহির্ভূতভাবে ফেলে রাখা হয়েছে বিপুল পরিমাণ নিলাম অযোগ্য দাহ্য রাসায়নিক ও বিস্ফোরক দ্রব্য। অন্যদিকে উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণের হ্যাঙ্গার কমপ্লেক্সেও নেই অগ্নিদুর্ঘটনা রোধে আন্তর্জাতিক মানের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা। এই অগ্নিকাণ্ড বিশ্বব্যাপী কার্গো ব্যবস্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএসহ ব্যবসায়ী নেতারা জানান, তাঁরা কয়েক বছর ধরেই কার্গো ভিলেজের আধুনিকায়ন ও অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা স্থাপনের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সেই দাবি পূরণ করতে না পারায়ই আজ এমন ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (অ্যামচ্যাম) সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অত্যন্ত সংবেদনশীল এই স্থানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা স্থাপনে কেউই সঠিক মনোযোগ দেয়নি।’ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লে. কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ‘শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে যদি ডিটেকশন ও প্রোটেকশন সিস্টেম থাকত, তাহলে এত বড় দুর্ঘটনা হতো না। এমন কোনো ব্যবস্থা আমরা পাইনি। ভবিষ্যতে এখানে এ ধরনের সিস্টেম স্থাপন করা জরুরি।’ জানা যায়, কাস্টম ছাড়পত্র প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে পণ্য জমতে থাকে, আর সীমিত স্থানের জন্য এই সংকট আরো তীব্র হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিমানবন্দরের কাস্টম হাউসের ভেতরের গুদামগুলো এখন নিলাম অযোগ্য ও বাজেয়াপ্ত করা পণ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিপুল পরিমাণ দাহ্য রাসায়নিক, পারফিউম, বডি স্প্রে, স্পিরিট এবং বিভিন্ন ধরনের বিস্ফোরক জাতীয় ‘বিপজ্জনক পণ্য’। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের পণ্য বিশেষায়িত গুদামে নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় এবং সাধারণ পণ্য থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে রাখতে হয়। কিন্তু শাহজালালের কাস্টমস গুদামে সাধারণ পণ্যের সঙ্গেই এসব দাহ্য পদার্থ ফেলে রাখা হয়েছে বছরের পর বছর। হ্যাঙ্গার কমপ্লেক্সের অবস্থাও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রায় পাঁচ বছর ধরে অচল পড়ে আছে পুরো অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। অথচ হ্যাঙ্গার কমপ্লেক্সে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি আর কেমিক্যাল মজুদ থাকে। দেশের অর্থনীতি ধুঁকছে। শিল্প, কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। রপ্তানি অত্যন্ত চাপের মুখে রয়েছে। এমন সময়ে দেশের প্রধান বিমানবন্দরের গুদামে এ ধরনের অগ্নিকাণ্ডকে অর্থনীতির জন্য একটি বড় ধরনের আঘাত হিসেবেই দেখা হচ্ছে। আমরা আশা করি, অগ্নিকাণ্ডের ফলে ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।

