দেশে চাঁদাবাজি ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। শিল্প মালিক থেকে ফুটপাতের হকার—কেউই নিরাপদ নয় চাঁদাবাজদের হাত থেকে। ব্যবসা চলুক বা বন্ধ হয়ে যাক, তাতে চাঁদাবাজদের কিছু যায় আসে না। চাঁদা তাদের দিতেই হবে।
তা না হলে চাপাতি-রামদা দিয়ে কুপিয়ে রাস্তায় ফেলে রাখবে, গুলি করবে, বাড়িতে হামলা হবে। শুধু ব্যবসায়ীরা নন, সাধারণ মানুষও নানাভাবে চাঁদাবাজির শিকার। জমি বেচাকেনা, বিয়েশাদি, সামাজিক অনুষ্ঠানাদিসহ নানা ক্ষেত্রেই গুনতে হয় মোটা অঙ্কের চাঁদা। গ্রাম পর্যায়ে মাছ চাষ, মুরগি পালনও চাঁদাবাজির আওতামুক্ত নয়।
তবে ব্যবসায়ীদের অবস্থাই সবচেয়ে শোচনীয়।গতকাল প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে লাগামহীন চাঁদাবাজির অসহনীয় চিত্র উঠে এসেছে। উঠে এসেছে ব্যবসায়ীদের সীমাহীন দুর্ভোগ ও অস্তিত্ব সংকটের নানা দিক। দিন কয়েক আগে রাজধানীর পল্লবীতে সন্ত্রাসীরা একজন ব্যবসায়ীকে চাঁদা চেয়ে হুমকি দেয় এভাবে, ‘তুই বড় ব্যবসায়ী।পাঁচ কোটি টাকা দিবি আমাদের, নইলে মাইরা ফালামু। বাঁচবে না তোর পরিবার।’ চাহিদামতো চাঁদার টাকা না পেয়ে সন্ত্রাসীরা ওই ব্যবসায়ীর পায়ে গুলি করে। এরপর তিনি চরম আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। শুধু পল্লবীর ওই ব্যবসায়ীর ক্ষেত্রেই নয়, রাজধানীসহ সারা দেশে গত বছরের ৫ আগস্টের পর এ রকম অনেক ঘটনা ঘটেছে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক এক পরিচালক গতকাল বলেন, তাঁর কারখানা চট্টগ্রাম ইপিজেডে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁর কাছে চাওয়া হয় মোটা অঙ্কের চাঁদা। চাঁদা না দেওয়ায় হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে। ভয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রামের স্বনামধন্য এক নারী উদ্যোক্তা জানান, তাঁর কাছে নগরের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী (বড় সাজ্জাদ) এক কোটি টাকা চাঁদা চেয়েছে। চাঁদা না পেয়ে একাধিকবার পরিবারের সবাইকে হত্যার হুমকি দিয়েছে। তিনি ও তাঁর পরিবারের সবাই এখন আতঙ্কে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, গুলিস্তান, নিউ মার্কেট, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, তেজগাঁও, উত্তরা, মতিঝিল এবং পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকার ফুটপাতে বেপরোয়া চাঁদাবাজির তথ্য পাওয়া গেছে। এসব এলাকার ব্যবসায়ীরা জানান, তাঁরা প্রতিদিন ১০০ থেকে ৫০০ টাকা চাঁদা দেন। তাঁরা জানান, চাহিদামতো চাঁদা না দিলে সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হতে হয়। এই পরিস্থিতি শুধু ঢাকা বা চট্টগ্রামে নয়, কমবেশি সারা দেশেই। দেশের প্রায় সব হাট-বাজারে চাঁদাবাজি এখন প্রতিদিনের ঘটনা। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, চাঁদাবাজির ঘটনায় গত ১৪ মাসে সারা দেশে শতাধিক ব্যক্তি খুন হয়েছেন। শুধু রাজধানীতেই খুন হয়েছেন অন্তত ২০ জন।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, ‘চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করতে সারা দেশে পুলিশ তৎপর রয়েছে। এরই মধ্যে অনেক চাঁদাবাজ সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’ কিন্তু বাস্তবতা হলো, চাঁদাবাজি না কমে দিন দিন বেড়েই চলেছে। এর মধ্যে যেমন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজি রয়েছে, তেমনি রয়েছে শীর্ষ সন্ত্রাসী ও চিহ্নিত অপরাধীদের চাঁদাবাজি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে যে হারে চাঁদাবাজির বিস্তার হচ্ছে, যেভাবে অপরাধ বাড়ছে তাতে ব্যবসা-বাণিজ্য দূরের কথা, মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। নির্বাচনের সময় যত এগিয়ে আসবে অপরাধের মাত্রা তত বাড়বে। তাই অবিলম্বে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে পদক্ষেপ নিতে হবে। মানুষকে ন্যূনতম স্বস্তি দিতে হবে।

