১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ  । ৩০শে নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ 

বাংলাদেশ যেভাবে ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানিকারকদের ‘কাঁদিয়ে ছাড়ছে’

প্রতিদিনের ডেস্ক
দীর্ঘদিন ধরেই স্থবির হয়ে আছে ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানি। দেশটির সরকার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিষয়টি বুঝতে না পারলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর প্রধান কারণ বাংলাদেশের স্বনির্ভর হওয়ার উদ্যোগ ও পাকিস্তান ও চীনের মতো বিকল্প বাজার থেকে আমদানির প্রবণতা।এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কারণ হলো, নয়া দিল্লি অভ্যন্তরীণ মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে একপর্যায়ে পেঁয়াজ রপ্তানি সাময়িকভাবে বন্ধ করেছিল। সেই ধাক্কায় একসময় ভারতের এক-তৃতীয়াংশ পেঁয়াজ আমদানিকারী বাংলাদেশ গত আট মাসে বলতে গেলে কিছুই কেনেনি, যদিও ঢাকায় পেঁয়াজের দাম এখনো ভারতীয় বাজারের তিনগুণ। আবার সৌদি আরবও প্রায় এক বছর ধরে খুব কম পরিমাণে ভারতীয় পেঁয়াজ কিনছে।ভারতীয় রপ্তানিকারকদের দাবি, অবৈধভাবে ভারতীয় পেঁয়াজের বীজ রপ্তানি হওয়ায় এসব দেশ এখন নিজেরাই উৎপাদন বাড়িয়ে তুলছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের বহু বছরের আধিপত্য কমে যাচ্ছে।ভারতের হর্টিকালচার প্রোডিউস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এইচপিইএ) সাবেক প্রধান এবং অভিজ্ঞ রপ্তানিকারক অজিত শাহ বলেন, আমাদের পণ্যের মান ভালো হওয়ায় আমরা অতীতে অতিরিক্ত দাম নিতে পেরেছি। কিন্তু দীর্ঘ দিন বাজারে না থাকায় ক্রেতারা বিকল্প খুঁজে নিয়েছেন। এখন আর মান দিয়ে নয়, আমাদের সঙ্গে অন্যদের দামের তুলনা করে বাজার নির্ধারণ হচ্ছে।
২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ভারত বিভিন্ন ধরনের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা দেয়। এর আগেও ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে টানা ছয় মাস এবং ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে পাঁচ মাস পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ ছিল। ফলে ভারতীয় পেঁয়াজের উপর নির্ভরশীল দেশগুলোতে দাম বেড়ে যায়। ২০২০ সালে ভারতীয় রপ্তানি নীতির ঘন ঘন পরিবর্তন নিয়ে বাংলাদেশ ভারতকে কূটনৈতিক বার্তাও পাঠিয়েছিল।বর্তমানে বাংলাদেশের সরকার স্থানীয় কৃষকদের সুরক্ষা ও উৎপাদন বাড়াতে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি করছে না। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারত বাংলাদেশে ৭ দশমিক ২৪ লাখ টন পেঁয়াজ রপ্তানি করে, যা ওই বছরের ভারতের মোট ১৭ দশমিক ১৭ লাখ টন রপ্তানির ৪২ শতাংশ। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল-সেপ্টেম্বর সময়ে বাংলাদেশে রপ্তানি কমে নেমে আসে মাত্র ১২ হাজার ৯০০ টনে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার মনে করছে, ঢাকার বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিও ভারতীয় পেঁয়াজ গ্রহণে অনীহা তৈরি করেছে।তবে রপ্তানিকারকদের দাবি, ঘন ঘন রপ্তানি নীতি পরিবর্তনই মূলত ভারতকে ঐতিহ্যবাহী বাজারগুলো থেকে ছিটকে দিয়েছে। ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বোর্ড অব ট্রেডের শাসন পরিষদের সদস্য এবং মহারাষ্ট্র সরকারের পেঁয়াজ নীতি কমিটির প্রধান পাশা প্যাটেল বলেন, আমরা শুধু ঐতিহ্যবাহী বাজারই হারাইনি, ভারতীয় পেঁয়াজের বীজ ব্যবহার করে এসব দেশ নিজেরাই স্বনির্ভর হয়ে উঠছে।রপ্তানিকারকদের ভাষ্য, প্রায় এক বছর ধরে সৌদি আরবও ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রেখেছে। সরকার এ বিষয়ে জানতে চাইলে রপ্তানিকারকরা জানান, সৌদি কর্তৃপক্ষ ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানির অনুমতিপত্র দেওয়া বন্ধ করেছে।এইচপিইএ সরকারকে জানায়, ইয়েমেন ও ইরান থেকে প্রতিযোগিতামূলক দামে পেঁয়াজ পাওয়া যাচ্ছে ও সৌদির স্থানীয় উৎপাদনও এখন যথেষ্ট। ব্যবসায়ীরা বলেন, এমনকি ফিলিপাইনও কেবল তখনই ভারতীয় পেঁয়াজ কেনে, যখন চীন থেকে আমদানি করা সম্ভব হয় না।২০২০-২১ সালে ভারত সৌদি আরবে ৫৭ হাজার টন পেঁয়াজ রপ্তানি করেছিল। পরের বছরগুলোতে তা কমতে কমতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২২৩ টনে।
এমন পরিস্থিতিতে রপ্তানিকারকরা হর্টিকালচার কমিশনারকে প্রতিযোগী দেশগুলোতে পেঁয়াজের বীজ রপ্তানি বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন।এইচপিইএ’র সহসভাপতি বিকাশ সিংহ বলেন, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও অন্যান্য প্রতিবেশী দেশ ভারতীয় পেঁয়াজের বীজ ব্যবহার করে উৎপাদন করছে। এটি ভারতীয় কৃষকদের জন্য বড় হুমকি। ভারতীয় পেঁয়াজের বীজ চীন ও পাকিস্তানেও ব্যাপক চাহিদা পাচ্ছে।
সূত্র: দ্য ইকোনমিক টাইমস

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়