৫ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ১৯শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

মুক্তির উপায় খুঁজতে হবে

বর্তমান বিশ্বে শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নির্ভরতা এক গভীর সামাজিক সংকটে রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। গবেষণা বলছে, ৮ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশুদের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশই বিভিন্ন মাত্রায় সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্ত। এতে পড়াশোনা, মানসিক গঠন, সামাজিক আচরণ এবং শারীরিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।তবু অভিভাবকদের অনেকেই ব্যস্ততার কারণে সন্তানের হাতে ফোন তুলে দিয়ে সাময়িক স্বস্তি নেন। ফলে অজান্তেই শিশুকে ঠেলে দেন বিপদের দিকে।
প্রতিবেদন বাংলাদেশে শিশু-কিশোরদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্তির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। ১৩ বছর বয়সী মাহির (ছদ্মনাম) মতো অসংখ্য শিশু আজ সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ট্যাব, ফোন আর শর্ট ভিডিও প্ল্যাটফর্মের নেট দুনিয়ায় মগ্ন।এটি শুধু বিনোদনের বিষয় নয়, বরং শিশুদের সামগ্রিক বিকাশের ওপর এক গুরুতর ও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) হিসাব অনুযায়ী, ১৩ কোটির বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু-কিশোর। এ নিয়ে গবেষণাগুলো মাইল্ড (মৃদু) থেকে সিভিয়ার (তীব্র) ইন্টারনেট আসক্তির উপস্থিতি প্রমাণ করে, যা খাদ্যাভ্যাসের ব্যাধি (ইটিং ডিস-অর্ডার) এবং স্থূলতার (ওবেসিটি) মতো স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের কমিউনিটি ও সোশ্যাল সাইকিয়াট্রি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মুনতাসীর মারুফের মতে, এই আসক্তির ফলে শিশুদের মধ্যে পড়াশোনায় মনোযোগের অভাব, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, নিদ্রাহীনতা এবং পরবর্তী সময়ে বিষণ্নতা ও উদ্বেগের মতো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।
অন্যদিকে সাইবার ইউনিটগুলোতে শিশু-কিশোরদের মানসিক বিপর্যয়, বুলিং, অনলাইন জুয়া ও পর্নোগ্রাফিতে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ বাড়ছে। এসবই স্পষ্ট করে, এই সমস্যা আর প্রযুক্তিগত নয়, এটি একটি সার্বিক জনস্বাস্থ্য সংকট।
এই প্রেক্ষাপটে অস্ট্রেলিয়ার সাম্প্রতিক উদ্যোগ বিশ্বব্যাপী আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দেশটি ১৬ বছরের কম বয়সীদের সমাজমাধ্যম নিষিদ্ধ করে নজির তৈরি করেছে। আমাদের নীতিনির্ধারকদের নতুন করে ভাবতে হবে।
জরুরি হচ্ছে শিশুদের ডিজিটাল সুরক্ষায় সমন্বিত পদক্ষেপ। পরিবার, স্কুল ও রাষ্ট্র—সবার মধ্যে দায়িত্ববোধ গড়ে ওঠা প্রয়োজন। মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞদের মত অনুযায়ী, স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ, পরিবারে বিকল্প বিনোদনের সুযোগ তৈরি, অভিভাবকের আচরণে সঠিক উদাহরণ স্থাপন এবং শিশুদের সঙ্গে নিয়মিত খোলামেলা আলাপ—এসবই পরিস্থিতি বদলাতে পারে। প্রযুক্তি নিষিদ্ধ নয়, তবে ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত হওয়া চাই। এখনই সময় বাস্তবসম্মত নীতি, পারিবারিক নজরদারি ও প্রযুক্তিগত দায়িত্বশীলতার সমন্বয়ে শিশুদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল পৃথিবী গড়ে তোলার।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়