আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় এক অগ্নিপরীক্ষা। নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল ততই অনিশ্চয়তা ও অবিশ্বাসে ঘিরে ফেলছে জনজীবনকে। একদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর অপতথ্যের বিস্তার, অন্যদিকে মাঠ পর্যায়ে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা—দুটি প্রবণতাই একইভাবে নির্বাচনী পরিবেশকে বিপজ্জনক করে তুলছে। এই দুই হুমকির প্রকৃতি আলাদা হলেও ফল এক—ভোটারকে বিভ্রান্ত ও আতঙ্কগ্রস্ত করা, নির্বাচনী আস্থা ক্ষয় করা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দেওয়া।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো এক শঙ্কাজনক চিত্র তুলে ধরছে। গত এক মাসে নির্বাচনকেন্দ্রিক এআই অপতথ্য বা ডিপফেক ভিডিওর হার অন্তত চার গুণ বেড়েছে। দেখা যাচ্ছে, এআই প্রযুক্তির অগ্রগতির সুযোগে ডিপফেক ভিডিও, ভয়েস ক্লোনিং, মনগড়া জরিপ ও নকল সংবাদ—সবকিছু মিলিয়ে যেন এক নতুন ধরনের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ শুরু হয়েছে। নেতাদের বক্তব্য নকল করে তৈরি ভিডিও মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ছে, প্রার্থীদের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে বানানো হচ্ছে অশ্লীল কনটেন্ট, আর দলীয় পরিচয় দিয়ে ছড়ানো হচ্ছে কাল্পনিক ‘নির্বাচনী বিশ্লেষণ’।
রাষ্ট্রীয় সংস্থা যে হারে এসব ভুয়া কনটেন্ট শনাক্ত করছে, তার চেয়ে অনেক বেশি গতিতে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন অপতথ্য। শুধু তা-ই নয়, এআই জেনারেটেড ভুয়া নিউজ কার্ড এবং বট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ‘মাইক্রো-টার্গেটিং’ করে ভোটারদের মনস্তত্ত্বকে বিষিয়ে তোলার চেষ্টা চলছে। সাইবার যুদ্ধের এই নতুন কৌশলে সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হলো, ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব মিথ্যার গতি সাধারণ সত্যের চেয়ে বহুগুণ বেশি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই প্রযুক্তিগত সুনামি মোকাবেলায় আমাদের রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর সক্ষমতা এখনো প্রশ্নবিদ্ধ।
যদিও নির্বাচন কমিশন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ডিজিটাল নজরদারির কথা বলছে, কিন্তু অপরাধীদের গতির সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো বিশেষজ্ঞ জনবল ও কারিগরি প্রযুক্তির অভাব স্পষ্ট। প্রস্তাবিত ‘জাতীয় এআই নীতিমালা ২০২৬-২০৩০’ ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও বর্তমান নির্বাচনের জন্য জরুরি হলো তাত্ক্ষণিক সাড়াদান ব্যবস্থা বা ‘রিয়াল টাইম রেসপন্স’। বিশেষ করে ভারতের মতো এআই কনটেন্টে ‘লেবেলিং’ বা চিহ্ন ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা আমাদের এখানেও প্রয়োগ করা জরুরি। পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ের আইন-শৃঙ্খলার অবনতি মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো আবির্ভূত হয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর লুণ্ঠিত বিপুল পরিমাণ মারণাস্ত্র এখনো উদ্ধার না হওয়া এবং নির্বাচনী সংঘাতে প্রাণহানি ভোটারদের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে।
রাজনৈতিক দলগুলো যেসব ভাষায় ও ভঙ্গিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে উত্তেজিত করে তুলছে, তা সহিংসতার পরিবেশ আরো ঘনীভূত করছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সমন্বিত সেল গঠন করলেও সহিংসতামুক্ত ভোটের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা ও সহনশীল আচরণ অপরিহার্য। প্রযুক্তির এই যুগে শুধু ভোটকেন্দ্র পাহারা দিলেই চলবে না, পাহারা দিতে হবে ভোটারের মন ও ডিজিটাল আঙিনাকেও। প্রয়োজন দ্রুত, দৃঢ় ও সমন্বিত পদক্ষেপ। অপতথ্যের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ যতই দেরি হবে, ততই জনমানসে সত্য ও অসত্যের বিভাজন দুর্বল হয়ে পড়বে। একইভাবে লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে যদি চিরুনি অভিযান না চালানো হয়, তাহলে নির্বাচন যতই নিকটবর্তী হবে, নিরাপত্তাহীনতা ততই বাড়বে।
সব শেষে বলা যায়, এই নির্বাচন শুধু দল ও প্রার্থীর প্রতিযোগিতা নয়, এটি সত্য ও মিথ্যা, শান্তি ও সহিংসতা, আস্থা ও অনাস্থার লড়াইও বটে। একটি স্থিতিশীল, পরিচ্ছন্ন ও স্বচ্ছ নির্বাচনী পরিবেশ রক্ষা করা রাষ্ট্র, প্রশাসন ও রাজনৈতিক দল—সব পক্ষের যৌথ দায়িত্ব। এই দায়িত্বে ব্যর্থতা শুধু একটি নির্বাচনের নয়, পুরো গণতান্ত্রিক ধারার জন্যই ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

