১২ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ২৫শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

মদ আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের আবদার

প্রতিদিনের ডেস্ক:
দেশে মদ আমদানিতে শুল্ক কমানোর প্রস্তাব দিয়েছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সামনে রেখে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) এ সংক্রান্ত প্রস্তাব পাঠিয়েছে বাংলাদেশ হোটেল রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। প্রকারভেদে বিয়ার, মদ ও হুইস্কিতে শুল্কভার তিন ভাগের এক ভাগে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।বিয়ার আমদানিতে শুল্কভার ৪৪২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫০ শতাংশ করার দাবি করা হয়েছে। এছাড়া ব্র্যান্ডি, হুইস্কি, রাম, জিন, ভদকা ও অন্যান্য লিকুয়ারে থাকা বিদ্যমান করভার ৬১১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০০ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।ব্যবসায়ীরা বলেছেন, শুল্ক কমানো হলে দেশে অবৈধ ও বিদেশি মদের প্রসার কমবে, একইসঙ্গে বাড়বে সরকারের রাজস্বও। তবে এনবিআর বলছে, কেবল রাজস্ব নয়, প্রস্তাবনাটি আমলে নেওয়ার আগে ধর্মীয় ও সামাজিক প্রভাবকে প্রাধান্য দেওয়া হবে।এনবিআরের তথ্যমতে, দেশে প্রতিবছরই বিদেশি মদ আমদানি বাড়ছে। প্রতি বছর ২ থেকে ৩ লাখ লিটার করে মদ আমদানি বেড়ে চলছে। বছরে গড়ে এখন প্রায় ৯ লাখ লিটার মদ আমদানি হচ্ছে। ২০২১ সালে প্রায় ৭ লাখ লিটার মদ আমদানি হলেও ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ লাখ লিটারে। ২০২২ সালে সাড়ে ৮ লাখ লিটার ও ২০২৩ সালে সাড়ে ১১ লাখ লিটার মদ আমদানি হয়েছে।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে নানা কারণে বিদেশে মদের বিক্রি ও চাহিদা বেড়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, দূতাবাস, নানা প্রকল্প চলমান থাকায় বিদেশিদের যাতায়াত ও বসবাস- বিদেশি মদের চাহিদা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এর বাইরে বিভিন্ন পার্টি ও ধনিক শ্রেণির রাতের আড্ডায় বিদেশি মদের চাহিদা রয়েছে। একইসঙ্গে দাম বেশি থাকায় অবৈধ পথেও আসছে বিদেশি মদ, বিক্রি হচ্ছে নকল বিদেশি মদও- যা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। একইসঙ্গে সরকারও হারাচ্ছে রাজস্ব।আসন্ন নতুন অর্থবছরের বাজেটকে সামনে রেখে প্রতিবছরের মতো বিভিন্ন বাণিজ্য সংগঠন থেকে প্রস্তাব আহ্বান করেছে এনবিআর। এরইমধ্যে বিভিন্ন সংগঠন থেকে এনবিআরে লিখিত প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বাজেট প্রণয়নের লক্ষ্যে এনবিআরে চলবে প্রাক-বাজেট আলোচনাও। এসব বৈঠকে বিভিন্ন সংগঠন তাদের কাছে প্রস্তাব তুলে ধরবে। মদ আমদানিতে শুল্ক কমানোর দাবি জানিয়ে এরইমধ্যে এনবিআরে প্রস্তাব পাঠিয়েছে বাংলাদেশ হোটেল রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরেও এই প্রস্তাবের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে। সংগঠনটির প্রস্তাবের একটি কপি জাগো নিউজের হাতে এসেছে।প্রস্তাবে দেখা গেছে, বর্তমানে বিদেশি বিয়ারে করভার রয়েছে ৪৪২.৬০ শতাংশ। এটি কমিয়ে ১৫০ শতাংশ কমানোর দাবি জানানো হয়েছে। ওয়াইনে বর্তমানে করভার রয়েছে ৫৯৬ দশমিক ২০ শতাংশ, তা কমিয়ে ১৫০ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ব্র্যান্ডি আমদানিতে করভার ৬১১ দশমিক ২০ শতাংশ, তা কমিয়ে ২০০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একইভাবে হুইস্কি, রাম, জিন, ভদকা ও অন্যান্য লিকুয়ার আমদানির করভার ৬১১ দশমিক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।এর যুক্তি হিসেবে বাংলাদেশ হোটেল রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন বলছে, বর্তমানে বিশ্বের অন্যান্য দেশসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের বর্তমান শুল্কহার অতি উচ্চমাত্রায় থাকায় আমদানি সংকুচিত হচ্ছে এবং অবৈধ পথে দেশে অ্যালকোহল ও অ্যালকোহল জাতীয় পানীয় প্রবেশ করায় সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অ্যালকোহল ও অ্যালকোহল জাতীয় পানীয়র বর্তমান শুল্কহার পুনরায় নির্ধারণের মাধ্যমে আমদানির সুযোগ সৃষ্টি এবং মরণঘাতি ড্রাগের প্রচলন প্রতিহত করা হলে রাজস্ব বাড়বে বলেও সংগঠনটির মত।জানতে চাইলে বাংলাদেশ হোটেল রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মেজর (অব.) এম জাহাঙ্গীর হোসাইন জাগো নিউজকে বলেন, ‘উচ্চ শুল্কের কারণে বৈধভাবে আমদানি করা বিদেশি মদের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। ধরেন, ১ হাজার টাকার একটি পণ্যের ওপর ৬০০-৭০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক, এরপর আবার ৩৯ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক ও ১৫ শতাংশ ভ্যাট যুক্ত হয়ে সেটি ১০ হাজার টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়। ব্যবসায়ীরা তখন বাধ্য হয়ে ১২ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। ফলে সাধারণ ক্রেতারা বারমুখী না হয়ে অবৈধ উৎসের দিকে ঝুঁকে পড়েন।’তিনি বলেন, ‘বর্তমানে প্রায় ৯৫ শতাংশ ভোক্তা অবৈধ উৎস থেকে মদ সংগ্রহ করছে। এতে সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে। পাশের দেশ থেকে চোরাচালান, মিসডিক্লারেশন এবং বিভিন্ন অবৈধ উপায়ে মদ দেশে প্রবেশ করছে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি করছে।’মদ আমদানিতে করভার কমানো হলে রাজস্ব ৩৫০ গুণ বাড়তে পারে এমন দাবি করে জাহাঙ্গীর হোসাইন বলেন, ‘যদি শুল্কহার ২০০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়, তাহলে বৈধ বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। আমরা মনে করি, এতে বিক্রি অন্তত ৯ গুণ বাড়তে পারে এবং সামগ্রিকভাবে সরকারের রাজস্ব প্রায় ৩৫০ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।’আমদানি প্রক্রিয়ার জটিলতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লাইসেন্সসহ নানা জটিলতার কারণে একটি কনসাইনমেন্ট ছাড় করতে ৬ মাস পর্যন্ত সময় লাগে। এতে ব্যবসায়ীরা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন এবং অনেকে বিকল্প (অবৈধ) পথে ঝুঁকছেন। উচ্চ শুল্ক ও জটিল প্রক্রিয়ার কারণে একদিকে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে সরকারও সম্ভাব্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শুল্ক কমানো হলে এই খাতে স্বচ্ছতা আসবে এবং বৈধ বাজার সম্প্রসারিত হবে।’এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনবিআরের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান  বলেন, ‘প্রস্তাবগুলো এখনও আমার হাতে আসেনি। এগুলো যখন আমার হাতে আসবে ওভারঅল সব দিক বিচার-বিবেচনা করা হবে। এক্ষেত্রে রাজস্বের প্রভাব কী হবে, সামাজিকভাবে কী প্রভাব পড়বে, আলোচনা করেই আমরা তা বিবেচনা করবো।’

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়