গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয় অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার। মানুষ আশা করেছিল, তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে। দেশে শান্তি আসবে। দেশের অর্থনীতি দ্রুত এগিয়ে যাবে। কিন্তু মানুষের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে। মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে, মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, খেলাপ ঋণের উল্লম্ফন হয়েছে, আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি হয়েছে, মব সন্ত্রাস ও গুপ্ত হত্যা বেড়েছে, ব্যাংকঋণের সুদহার বেড়েছে, বিনিয়োগে স্থবিরতা নেমেছে, রপ্তানি কমছে, বহু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, কর্মসংস্থান কমেছে এবং লক্ষাধিক শ্রমিক বেকার হয়েছেন, সরকারের দেশি-বিদেশি ঋণগ্রহণ বেড়েছে, দেশবিরোধী বাণিজ্যচুক্তি, বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়াসহ নেতিবাচক অনেক কিছুই ঘটেছে। এমন অবস্থায় দেশের অর্থনীতি ক্রমেই ভঙ্গুর হয়েছে। তাই অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ, সাবেক আমলা—সবাই তাতে কণ্ঠ মেলাচ্ছেন।
সারা দেশে হামে শত শত শিশুর মৃত্যু হচ্ছে। অথচ মানুষ ভুলেই গিয়েছিল যে হামে শিশুরা মারা যায়। এর প্রধান কারণ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা আমদানি করা হয়নি। টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় প্রতিরোধযোগ্য এই রোগটিই মহামারি আকারে দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে আজকে জ্বালানি সমস্যা প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। অথচ অন্তর্বর্তী সরকার জ্বালানির আপৎকালীন মজুদ রেখে যায়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে প্রায় হাজার কোটি ডলার। অবস্থা এমন হয়েছে যে বিদেশি ঋণের সুদ দিতে দিতেই পরবর্তী সরকারগুলো সর্বস্বান্ত হয়ে যাবে।ফলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এখন প্রায় শূন্য তহবিল আর বিপুল ঋণের বোঝায় বিপর্যস্ত-ভঙ্গুর অর্থনীতি সামাল দিতে দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। উন্নয়নে মনোযোগ দেওয়ার মতো সামর্থ্য কমে গেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান বদিউর রহমানের মতে, ড. ইউনূসের সরকার তো কোনো সরকারই ছিল না। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বাজে সরকার। এটি মাস্তান পার্টির মতো কাজ করেছে। এ সরকার গোটা জাতিকে কয়েক দশকের জন্য পিছিয়ে দিয়েছে। সিনিয়র ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ জাতির সঙ্গে রীতিমতো প্রতারণা করা হয়েছে। এত ভালো ভালো লোক আমাদের সঙ্গে এটা কী করল! এই জাতির তো বারোটা বাজানো হলো।’
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ব্যবসায়ীদের অবজ্ঞা-অবহেলা, হয়রানিমূলক মামলা, অ্যাকাউন্ট জব্দ, কারখানা বন্ধ করে লাখো লোকের চাকরি হারানো, পুঁজিবাজারকে তলানিতে নামিয়ে দেওয়া আর উচ্চ মূল্যস্ফীতির তাপে সাধারণ মানুষের জীবনকে একেবারে বিষিয়ে তোলা হয়। উচ্চ সুদহারে বিনিয়োগে স্থবিরতা চরমে। ওই সময়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে যায়। দেশের বড় বড় প্রকল্প বন্ধ রেখে, এডিপি বাস্তবায়নে রেকর্ড অদক্ষতা অথচ বিদেশি ঋণ বা ধারকর্জে কয়েক গুণ বেশি পারদর্শিতা বাংলাদেশকে এগোনোর বদলে বরং পিছিয়ে দিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের একটি প্রধান সমালোচনা ছিল খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়া। সেই সরকারের শেষ সময়ে অর্থাৎ ২০২৪ সালের জুন মাসে খেলাপি ঋণ ছিল প্রায় দুই লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা। অথচ ২০২৫ সালের জুন নাগাদ খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় পাঁচ লাখ ৩০ লাখ কোটি টাকায়। মাত্র এক বছরে বাড়ে তিন লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা।
ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দেশ ও দেশের অর্থনীতির যে ক্ষতি করে গেছে, তা থেকে উত্তরণ খুব সহজ নয়। তার পরও পরিকল্পিত উপায়ে উত্তরণের প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। অর্থনীতির প্রাণ বেসরকারি খাতকে চাঙ্গা করতে হবে।

