প্রশান্ত কুমার শীল
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। প্রায় দেড় দশকের শাসন শেষে তৃণমূল কংগ্রেসের পতন এবং ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-র সম্ভাব্য ভূমিধস জয়। এই ঘটনাকে অনেকে ‘ম্যাজিক’ বলে অভিহিত করেন। কিন্তু রাজনীতিতে কোনও ফলাফলই হঠাৎ ঘটে না; এর পেছনে থাকে দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, কৌশল এবং সামাজিক বাস্তবতার সমন্বয়। প্রশ্ন হলো—কোন সেই উপাদান, যার সমন্বয়ে পশ্চিম বাংলায় ফুটল পদ্ম?
পরিবর্তনের হাওয়া: অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী প্রবাহ
যে ফ্যাক্টরটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দাবি করে, সেটি হলো ‘পরিবর্তনের চাহিদা’। দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনে প্রশাসনিক ক্লান্তি, দুর্নীতির অভিযোগ এবং স্থানীয় পর্যায়ের দাপট—এই সব মিলিয়ে এক ধরনের ‘অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি’ বা প্রতিষ্ঠানবিরোধী মনোভাব তৈরি হয়েছিল। নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত ভোটারদের একটি বড় অংশ, যারা সাধারণত ‘ফ্লোটিং ভোটার’ হিসেবে পরিচিত, তারা এই পরিবর্তনের চোরাস্রোতে নিজেদের অবস্থান নির্ধারণ করেছে। যার ফলে পশ্চিম বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে—যখন পরিবর্তনের ঢেউ তৈরি হয়, তখন তা অনেক সময় শাসক দলকে সম্পূর্ণভাবে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এবারের ফলাফল সেই ধারারই পুনরাবৃত্তি।
ধর্মীয় মেরুকরণ: নির্বাচনী অঙ্কের নির্ণায়ক
বিজেপির উত্থানের অন্যতম প্রধান কারণ ধর্মীয় মেরুকরণ। হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক বয়ান, অভিন্ন দেওয়ানি বিধির প্রতিশ্রুতি এবং ‘অনুপ্রবেশকারী’ প্রসঙ্গ—এই সব ইস্যু মিলিয়ে একটি স্পষ্ট বিভাজনরেখা তৈরি করা হয়েছে। ফলে ভোটের অঙ্ক সহজ হয়েছে—হিন্দু বনাম মুসলমান। যদিও মুসলিম ভোট কিছু ক্ষেত্রে বিভক্ত হয়েছে, কিন্তু হিন্দু ভোটের উল্লেখযোগ্য সংহতি বিজেপির পক্ষে গেছে। এই সমীকরণই বহু আসনে বিজেপিকে এগিয়ে দিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানবিরোধী ক্ষোভ: শাসনের মূল্য
দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে যে ‘অবসাদ’ তৈরি হয়, তা তৃণমূল সরকারের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। কর্মসংস্থানের সংকট, শিল্প বিনিয়োগের অভাব, নিয়োগ দুর্নীতি, এবং স্থানীয় স্তরে ‘সিন্ডিকেট’ বা ‘কাটমানি’ সংস্কৃতির অভিযোগ—এসব বিষয় সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়িয়েছে। এই ক্ষোভকে রাজনৈতিক ভাষায় রূপান্তর করতে পেরেছে বিজেপি। তারা নিজেদের ‘পরিবর্তনের বাহক’ হিসেবে তুলে ধরেছে, যা ভোটারদের একাংশকে আকৃষ্ট করেছে।
কৌশলগত পরিবর্তন: অতীত থেকে শিক্ষা
২০২১ সালের নির্বাচনে বিজেপির যে কৌশলগত ভুল ছিল, এবার তা অনেকটাই সংশোধন করা হয়েছে। ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে সরে এসে প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে ইস্যু করা, ভিনরাজ্যের নেতাদের প্রভাব কমিয়ে স্থানীয় নেতৃত্বকে সামনে আনা—এই পরিবর্তনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহের তত্ত্বাবধানে সংগঠনকে পুনর্গঠন করা এবং গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব নিয়ন্ত্রণ করাও বিজেপির জন্য বড় সাফল্য।
‘বাঙালিয়ানা’ নির্মাণ: বহিরাগত তকমা ঝেড়ে ফেলা
বিজেপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ‘বহিরাগত’ তকমা। এই ইমেজ ভাঙতে তারা সচেতনভাবে ‘বাঙালিয়ানা’কে সামনে নিয়ে এসেছে। নরেন্দ্র মোদীর সাংস্কৃতিক প্রতীক ব্যবহার, স্থানীয় খাদ্যাভ্যাস ও ভাষার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া, এবং বাঙালি নেতৃত্বকে সামনে আনা—এসবই ছিল একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা। ফলে বিজেপি নিজেদের ‘বিকল্প’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে, যা আগে সম্ভব হয়নি।
কল্যাণনীতি বনাম প্রতিশ্রুতি রাজনীতি
তৃণমূল সরকার তাদের সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ভোটব্যাঙ্ক তৈরি করেছিল। কিন্তু বিজেপিও এবার একই পথে হেঁটেছে—বরং আরও বেশি প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছে। এই প্রতিযোগিতা ভোটারদের মধ্যে নতুন করে হিসাব-নিকাশ তৈরি করেছে—কে বেশি দেবে, কে বেশি উন্নয়ন করবে।
নির্বাচন কমিশন ও SIR বিতর্ক
এই নির্বাচনের একটি বিতর্কিত দিক হলো নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং এসআইআর (ভোটার তালিকা সংশোধন) প্রক্রিয়া। তৃণমূলের অভিযোগ হলো, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের ভোটব্যাঙ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিজেপি সুবিধা পেয়েছে। যদিও বিজেপি এই অভিযোগ অস্বীকার করে এবং কমিশনের নিরপেক্ষতার কথা বলে। তবু এই বিতর্ক নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বাস্তবতা যাই হোক, রাজনৈতিকভাবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: প্রতিধ্বনির রাজনীতি
এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিধ্বনি বাংলাদেশেও শোনা যাবে। বিশেষ করে ‘অনুপ্রবেশ’ ইস্যু এবং ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি দুই দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে। একই সঙ্গে তিস্তা চুক্তির মতো অমীমাংসিত ইস্যুতে নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে, যদি কেন্দ্র ও রাজ্যের সমন্বয় কার্যকর হয়।পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এই উত্থান কোনও একক ‘ম্যাজিক’-এর ফল নয়। এটি একাধিক উপাদানের সম্মিলিত ফল যেমন: পরিবর্তনের চাহিদা, ধর্মীয় মেরুকরণ, শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, কৌশলগত রাজনৈতিক পুনর্গঠন এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক।সব মিলিয়ে বলা যায়, পশ্চিম বাংলায় ফুটেছে পদ্ম। কিন্তু সেই ফুলের বীজ বহু আগে থেকেই বপন করা হয়েছিল।এখন দেখার বিষয়, এই পরিবর্তন কতটা স্থায়ী হয় এবং নতুন শাসন কতটা প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে। কারণ গণতন্ত্রে সবচেয়ে বড় সত্য হলো ভোটাররা যেমন পরিবর্তন আনে, তেমনই প্রয়োজনে সেই পরিবর্তনকেই প্রত্যাখ্যান করতেও দ্বিধা করে না।
লেখক : গণমাধ্যম শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

