প্রতিদিনের ডেস্ক:
মানবাধিকার একটি সর্বজনীন বিষয়। যারা ভিন্ন মতাদর্শ লালন করেন, তাদেরও এটি পাওয়ার অধিকার রয়েছে। একইসঙ্গে সরকারের সমালোচনা করার কারণে গ্রেপ্তার করা এবং জামিন না দিয়ে হয়রানি করার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।রোববার (৩ মে) রাজধানীর কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের মুক্তিযোদ্ধা হলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি আয়োজিত ‘জ্বালানি, অর্থনীতি, মানবাধিকার, সংস্কার ও গণভোট’ শীর্ষক জাতীয় কনভেনশনের তৃতীয় সেশনে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার: বর্তমান ঝুঁকি ও করণীয়’ বিষয়ে সেশনটি আয়োজিত হয়।
যেসব অধ্যাদেশ বিএনপির কাছে মিষ্টি লেগেছে, সেগুলো আইনে রুপান্তর করেছে
এই সেশনে সভাপতিত্ব করেন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ। এছাড়া বক্তব্য রাখেন আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী সারা হোসেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আশরাফ কায়সার, সাংবাদিক ও অ্যাক্টিভিস্ট জায়মা ইসলাম, গুম (প্রতিরোধ) কমিশনের সাবেক সদস্য নাবিলা ইদ্রিস, জাতীয় যুবশক্তির সভাপতি অ্যাডভোকেট তারিকুল ইসলাম এবং মানবাধিকার কর্মী মিনহাজ আমান।
সেশনটি সঞ্চালনা করেন এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আলামিন।
আসিফ মাহমুদ সজিব ভুঁইয়া বলেন, ৫ আগস্টের পর যখন সংবাদমাধ্যম দখল হওয়া শুরু করে, সময়ের পরিক্রমায় সেগুলো কেবল হাতবদল হয়েছে। গণমাধ্যম নিয়ে কাজ করতে গেলে যেকোনো সরকার চিন্তায় পড়ে যায়। এর পরিণতি কী হতে পারে, তা নিয়ে তারা চিন্তিত থাকে; সাংবাদিক ও মালিকরা ক্ষুব্ধ হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে চলে যেতে পারে, এমন শঙ্কা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও দেখা গেছে। আমাদের মূলধারার গণমাধ্যমের দলবদলের কারণে মানুষের বিশ্বাস উঠে যাচ্ছে, ফলে তারা নতুন গণমাধ্যমের দিকে ঝুঁকছে। অভ্যুত্থানের সময় যখন মূলধারায় আমাদের কণ্ঠ প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, তখন নতুন গণমাধ্যম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
তিনি বলেন, মানবাধিকার সার্বজনীন হওয়া উচিত। কিন্তু আমাদের যথেষ্ট আইনি কাঠামো না থাকার কারণে আমরা তা অনুশীলন করতে পারছি না এবং পুরোনো চর্চাই রয়ে যাচ্ছে। সাংবাদিকদের অনেকেই এখন গ্রেপ্তার অবস্থায় আছেন, আওয়ামী লীগের অনেকেই গ্রেপ্তার হয়ে আছেন। যথাযথ আইনি কাঠামো না থাকায় যারা ফ্যাসিবাদ হয়ে উঠতে সহায়তা করেছেন, তাদের এখন হিরো ট্রিটমেন্ট দেওয়া হচ্ছে; অথচ তাদের আরও কঠোর শাস্তি হওয়া দরকার ছিল।
ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, মানবাধিকার কেবল আমার দল ও মতাদর্শের মানুষের জন্য নয়, বরং এটি সবার জন্য হতে হবে। ভিন্ন মতাদর্শের মানুষের ক্ষেত্রেও অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার প্রযোজ্য হবে। বর্তমানে আমরা দেখছি যে জামিনই পাওয়া যাচ্ছে না। বিচারককে দশবার ভাবতে হয় তিনি জামিন দেবেন কি না। আমরাও চাই জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার সঠিকভাবে হোক, কিন্তু তদন্ত শেষ হচ্ছে না এবং অনেককেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া ছাড়াই আটকে রাখা হচ্ছে।
ড. নাবিলা ইদ্রিস বলেন, এই সরকারের সময়ে ২২ দিনে ৫ জনকে সরকারের বিরুদ্ধে লেখালেখির জন্য আটকের ঘটনা দেখেছি। অনেকে মনে করেন, আটকের পর জামিন দিলেই হয়তো সব শেষ; আসলে এটি হয়রানির শুরু। কারণ এরপর দিনের পর দিন মামলা চলতে থাকে। অভিযুক্তকে ভাড়া খরচ করে মামলার হাজিরা দিতে হয় এবং আইনজীবী নিয়োগ করতে হয়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই সরকার যাদের গ্রেপ্তার করেছে তারা খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যক্তি নন, তবুও তাদের আটক করার কারণ সেই পুরোনো প্যাটার্ন, ভয় তৈরি করা।
সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, যারা গুমের শিকার হয়ে বেঁচে ফিরেছেন, তাদের সবার এবং তাদের পরিবারের আলাদা দুঃখের কাহিনী আছে যা সেভাবে প্রচার হয়নি। আমি যখন আয়নাঘরের কথা বলি, তখন আমাকে ফেসবুকে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হতে হয়। বিগত সরকারের সময়ের হাজার হাজার গুমের বিচার অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। বিচার না হলে বর্তমানের সংশ্লিষ্টরা একই পথে পা বাড়ানোর সাহস পাবে।
ফ্যাক্ট-চেকার ও মানবাধিকারকর্মী মিনহাজ আমান বলেন, ভুয়া খবর কোনো ছোট বিষয় নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার সাথে জড়িত। কিন্তু সমস্যা হলো, কোনো ফ্যাক্ট-চেকিং সরকারের পক্ষে গেলে তারা গ্রহণ করে, অন্যথায় করে না। ৫ আগস্টের পর গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে অনেক সমালোচনা আছে। সাধারণ মানুষ ভুয়া খবর ছড়ালে বিচার হবে, কিন্তু সাংবাদিক ছড়ালে কী হবে? এখানে সাংবাদিকদের একটি ‘সেলফ রিয়ালাইজেশন’ বা আত্মোপলব্ধি দরকার। একটি সরি বা দুঃখপ্রকাশের মাধ্যমেও পুনর্মিলনের কাজ শুরু হতে পারে।
জাতীয় যুবশক্তির সভাপতি তরিকুল ইসলাম বলেন, আগে মতপ্রকাশের কারণে ডিজিটাল বা সাইবার নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার করা হলেও এখন সরাসরি মানহানির মামলা করা হচ্ছে। জাতীয় যুবশক্তির ঠাকুরগাঁও জেলার যুগ্ম সদস্য সচিবকে বর্তমান মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে মন্তব্য করার কারণে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমরা জানতে পেরেছি, সেখানকার বিচারক রোষানলে পড়ার ভয়ে জামিন দিতে ভয় পাচ্ছেন। এগুলোর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন, যা বর্তমানে দেখা যাচ্ছে না।

