২৬শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ৯ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

বিশ্বকাপ ১৯৯৪: আমেরিকার ফুটবলের নতুন জাগরণ

প্রতিদিনের ডেস্ক:
তপ্ত গ্রীষ্মের সেই দিনগুলোতে গ্যালারি ঠাসা দর্শক, নজরকাড়া জার্সি আর মাঠে ফুটবলারদের জাদুকরী পারফরম্যান্স মিলিয়ে ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে আছে। মাঠের খেলা ছাপিয়ে ফুটবল মহাযজ্ঞের সেই আয়োজনটি মার্কিন মুলুকে এক বড় সাংস্কৃতিক পরিবর্তনেরও সূচনা করেছিল। সে সময় পপ তারকা স্টিভি ওয়ান্ডার, হলিউড অভিনেতা রবিন উইলিয়ামস কিংবা অপরা উইনফ্রের মতো বিশ্বখ্যাত তারকাদের উপস্থিতিতে এই টুর্নামেন্ট পেয়েছিল রূপালি পর্দার এক জমকালো আবহ। তৎকালীন মার্কিন সকার প্রধান অ্যালান রোটেনবার্গ জানিয়েছিলেন, তারা এমন এক আবহ তৈরি করতে চেয়েছিলেন যাতে মনে হয় এটি এক অমূল্য টিকিট, যার অংশ হতেই হবে। ফিফার শর্ত মেনে নতুন একটি পেশাদার লিগ চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়ে আয়োজিত এই আসরটি শেষ পর্যন্ত গোটা উত্তর আমেরিকা মহাদেশে ফুটবলকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে।অথচ এই সফলতার পেছনের শুরুটা মোটেও মসৃণ ছিল না। সত্তরের দশকে পেলে কিংবা ফ্রাঞ্জ বেকেনবাউয়ারের মতো কিংবদন্তিদের এনে লিগ জমিয়ে তোলার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবলের কোনো শক্ত অবকাঠামোই অবশিষ্ট ছিল না। এমনকি অলিম্পিক কমিটির দেওয়া এক বিনমূল্যের ট্রেইলারে চলত মার্কিন সকার অ্যাসোসিয়েশনের কার্যক্রম। সেখান থেকে বিশ্বমানের স্টেডিয়াম প্রস্তুত করা এবং মাঠে নিজেদের অখ্যাত ফুটবলারদের নিয়ে গড়া অনভিজ্ঞ দলটিকে লড়াইয়ের উপযোগী করে তোলার গুরুদায়িত্ব পড়েছিল কোচ বোরা মিলুতিনোভিচের ওপর। সব বাধা পেরিয়ে মূল আসরে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায় স্বাগতিকরা। একই সময়ে মাঠের বাইরে মার্কিন পপ সংস্কৃতির উন্মাদনার পাশাপাশি টিভিতে ও জে সিম্পসনের গাড়ি তাড়া করার লাইভ দৃশ্য দেখার মতো পরাবাস্তব ঘটনাও ফুটবলারদের রোমাঞ্চিত করেছিল।টুর্নামেন্টের মাঠের লড়াইয়ে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ফেভারিট ইতালির আকস্মিক হার কিংবা মার্কিন তারকা এরিক উইনাল্ডার দুর্দান্ত ফ্রি-কিক দর্শকদের বুঁদ করে রেখেছিল। তবে সব আলো কেড়ে নিয়েছিলেন ফুটবলের মহাদেবতা ডিয়েগো ম্যারাডোনা। পনের মাসের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ফিরে গ্রিসের বিপক্ষে করা চোখধাঁধানো গোলের পর ক্যামেরার সামনে তাঁর সেই বুনো উদযাপন আজও ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে ভাস্বর। কিন্তু নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের পর ডোপ টেস্টে পজিটিভ হয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে ম্যারাডোনার বিদায় টুর্নামেন্টের অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি হয়ে দাঁড়ায়। এর চেয়েও বড় মানবিক বিপর্যয় ঘটে কলম্বিয়া শিবিরে। নিজ দেশের ড্রাগ কার্টেলগুলোর প্রাণনাশের হুমকির মুখে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে খেলতে নেমে এক আত্মঘাতী গোল করে বসেন কলম্বিয়ান ডিফেন্ডার আন্দ্রেস এসকোবার। টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়ে দেশে ফেরার মাত্র দশ দিনের মাথায় মেদেলিন শহরের এক পার্কিং লটে গুলি করে হত্যা করা হয় এই তরুণ ফুটবলারকে, যা পুরো ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ করে দেয়।
এদিকে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র ৪ জুলাই তাদের স্বাধীনতা দিবসের দিনে শক্তিশালী ব্রাজিলের মুখোমুখি হয়ে বীরত্বপূর্ণ লড়াই শেষে বিদায় নেয়। অন্যদিকে রোমানিয়ার জর্জে হাজি ও বুলগেরিয়ার রিস্টো স্টোইচকভের মতো মহাতারকারা তাদের জাদুকরী ফুটবল দিয়ে নিজ নিজ দলকে নিয়ে যান অনন্য উচ্চতায়। ইতালির ত্রাতা হয়ে উঠেছিলেন ‘দ্য ডিভাইন পনিটেল’ খ্যাত রবার্তো বাজ্জো। নকআউট পর্বের প্রতিটি ম্যাচে গোল করে ইতালিকে একাই টেনে ফাইনালে তোলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত রোজ বোল স্টেডিয়ামের ফাইনালে মুখোমুখি হয় দুই পরাশক্তি ব্রাজিল ও ইতালি। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ের খেলা গোলশূন্য থাকার পর ইতিহাসের প্রথম ফাইনাল হিসেবে ম্যাচটি গড়ায় পেনাল্টি শুটআউটে। সেখানে পুরো টুর্নামেন্টের নায়ক রবার্তো বাজ্জোর নেওয়া শেষ শটটি যখন ক্রসবারের ওপর দিয়ে চলে যায়, তখন বিষাদের নীল বেদনায় ঢেকে যায় ইতালি। আর প্রয়াত রেসিং লিজেন্ড আয়রটন সেনার স্মৃতিকে স্মরণ করে উল্লাসে মেতে ওঠে সেলেসাওরা।
ফুটবলকে মার্কিনদের হৃদয়ে পৌঁছে দেওয়ার যে স্বপ্ন নিয়ে এই বিশ্বকাপের আয়োজন করা হয়েছিল, তা শতভাগ সফল হয় এর দুই বছর পর মেজর লিগ সকার (এমএলএস) চালুর মাধ্যমে। সময়ের পরিক্রমায় আজ ডেভিড বেকহ্যাম, জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ কিংবা লিওনেল মেসির মতো মহাতারকারা আমেরিকার লিগে খেলছেন। এক সময় যেখানে মার্কিন টিভিতে ফুটবল সম্প্রচারের জায়গা ছিল না, আজ সেখানে শপিং মল থেকে শুরু করে খেলার মাঠে শিশুদের পায়ে ফুটবলের জয়জয়কার। ইতিহাসের সর্বোচ্চ দর্শক উপস্থিতির সেই মার্কিন বিশ্বকাপ কেবল ব্রাজিলের চতুর্থ শিরোপা জয়ের গল্পই নয়, বরং এটি ছিল একটি ফুটবলবিমুখ জাতিকে চিরতরে ফুটবলের প্রেমে ফেলার এক ঐতিহাসিক মহাকাব্য।
সূত্র: বিবিসি

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়