ফারুক যোশী
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক। ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা দীর্ঘদিনের। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক কথিত ‘পুশ-ইন’ বা জোরপূর্বক মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর অভিযোগ নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এই পরিস্থিতি শুধু দুই দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রশ্নই নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধের বিষয়টিও সামনে নিয়ে এসেছে।
সাম্প্রতিক কয়েক দিনে বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে দুই শতাধিক মানুষকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা হয়েছে বলে জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বিজিবির দাবি, গত ৩ জুন থেকে ৭ জুন পর্যন্ত অন্তত ২১টি পৃথক ঘটনায় বিএসএফের পুশ-ইন প্রচেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের সঙ্গে ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের ২৬টি জেলায় নজিরবিহীন সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং অতিরিক্ত বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে মোট ২ হাজার ৪৭৯ জনকে বাংলাদেশে পুশ-ইন করা হয়েছিল, যাদের মধ্যে ১২০ জন ছিলেন ভারতীয় নাগরিক। সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি সীমান্ত ব্যবস্থাপনার একটি গভীর সংকটের ইঙ্গিত বহন করে।
আইন ও রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ার প্রশ্ন
যদি কোনো ব্যক্তি সত্যিই বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে থাকেন এবং অবৈধভাবে ভারতে অবস্থান করেন, তাহলে তাদের প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। সাধারণত নাগরিকত্ব যাচাই, কনস্যুলার যোগাযোগ, তথ্য বিনিময় এবং দ্বিপক্ষীয় সমন্বয়ের মাধ্যমেই এমন বিষয় নিষ্পত্তি করা হয়।
কিন্তু কোনো ব্যক্তিকে তার বাসস্থান বা অস্থায়ী আবাস থেকে আটক করে, যথাযথ পরিচয় যাচাই ছাড়া সীমান্তে এনে অন্য দেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনার স্বীকৃত নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ কারণেই বাংলাদেশ সরকার এবং বিজিবি বারবার বলছে, বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা ও আন্তর্জাতিক রীতিনীতির পরিপন্থি কোনো পুশ-ইন গ্রহণযোগ্য নয়।
সমস্যাটি আরও জটিল হয়ে ওঠে, যখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত করা যায় না। একদিকে ভারত তাদের গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়, অন্যদিকে বাংলাদেশও যাচাই ছাড়া তাদের প্রবেশের অনুমতি দেয় না। ফলে বহু মানুষ সীমান্তবর্তী ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’ কিংবা সীমান্তের অনিশ্চিত অঞ্চলে মানবেতর অবস্থায় পড়ে থাকেন। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা-উদ্বেগ এবং মানবাধিকারের প্রয়োজনীয়তার মধ্যে তখন এক কঠিন দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।
মানবিক সংকটের মুখোমুখি মানুষ
রাষ্ট্রের সীমান্ত আছে, কিন্তু মানবিকতার কোনো সীমান্ত নেই—আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যবস্থার অন্যতম মৌলিক দর্শন এটি। সীমান্তে আটকে পড়া মানুষদের মধ্যে শিশু, নারী ও বৃদ্ধরাও রয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে। তাদের অনেকের কাছে পর্যাপ্ত খাদ্য, আশ্রয় কিংবা চিকিৎসার সুযোগ নেই।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অভিবাসন ও অনিয়মিত প্রবেশ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হলেও অধিকাংশ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র একটি বিষয় স্বীকার করে—মানুষকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে রাখা বা জীবনঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। ইউরোপ কিংবা যুক্তরাজ্যে অনিয়মিতভাবে প্রবেশ করা অভিবাসীদের বিষয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক প্রবল হলেও রাষ্ট্র সাধারণত আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় তাদের পরিচয় যাচাই, আশ্রয়ের আবেদন বা প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করে। মানবিক সহায়তার ন্যূনতম সুযোগও নিশ্চিত করা হয়।
দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতায়ও একই মানবিক মানদণ্ড অনুসরণ করা প্রয়োজন। কারণ সীমান্তে আটকে থাকা মানুষদের বড় অংশই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের নির্মাতা নন; তারা বরং সেই সিদ্ধান্তের ভুক্তভোগী।
সীমান্ত হত্যা: আরেকটি অমীমাংসিত ইস্যু
পুশ-ইন বিতর্কের পাশাপাশি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনাও দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বিষয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিএসএফের হাতে ৩৪ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এর আগে ২০২৪ সালে নিহত হন ৩০ জন এবং ২০২৩ সালে ৩১ জন।
প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের আলোকে এসব ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত। সীমান্ত অপরাধ দমনের প্রয়োজনীয়তা যেমন রয়েছে, তেমনি প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের পরিবর্তে মানবিক ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি অনুসরণের প্রত্যাশাও রয়েছে।
দিল্লির সম্মেলন: সমাধানের সুযোগ
৮ থেকে ১১ জুন নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৭তম সম্মেলন এই সংকট নিরসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হতে পারে। অবৈধ পুশ-ইন বন্ধ, সীমান্ত হত্যা রোধ, মানবপাচার প্রতিরোধ, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান দমন এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন প্রশ্ন সেখানে আলোচনায় আসছে।
দুই দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে আস্থা ও তথ্য বিনিময় বাড়ানো গেলে অনেক সমস্যার কার্যকর সমাধান সম্ভব। বিশেষ করে যেসব ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তাদের বিষয়ে একটি স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া গড়ে তোলা জরুরি।
মানবিকতার রাজনীতি প্রয়োজন
সীমান্ত নিরাপত্তা রাষ্ট্রের বৈধ দায়িত্ব। তবে সেই দায়িত্ব পালনের মধ্যেও মানবিকতা, আইনের শাসন এবং আন্তর্জাতিক নীতিমালার প্রতি শ্রদ্ধা থাকা আবশ্যক। হাজার হাজার মানুষকে পরিচয়হীন, আশ্রয়হীন ও অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে ফেলে রাখা কোনো সভ্য রাষ্ট্রের জন্য কাম্য হতে পারে না।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের বহু মিল রয়েছে। এই বাস্তবতায় সীমান্ত প্রশ্নে প্রতিযোগিতামূলক কঠোরতার পরিবর্তে মানবিক সহযোগিতার পথই অধিক কার্যকর হতে পারে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব হলো এমন সমাধান খুঁজে বের করা, যাতে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা যেমন নিশ্চিত হয়, তেমনি মানুষের মৌলিক মর্যাদাও অক্ষুণ্ন থাকে। রাষ্ট্রের শক্তি তার সীমান্ত রক্ষার সক্ষমতায় যেমন প্রকাশ পায়, তেমনি প্রকাশ পায় বিপন্ন মানুষের প্রতি তার আচরণেও। সীমান্তে আজ যে প্রশ্নটি সবচেয়ে জোরালো হয়ে উঠেছে, তা কেবল নিরাপত্তার নয়; এটি মানবিকতারও পরীক্ষা।
লেখক : ব্রিটেনপ্রবাসী কলামিস্ট।

